ভয় ও উদ্বেগ: বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন মনের খেলা
বর্তমান জীবনের দৌড়ঝাঁপে ভয় ও উদ্বেগ যেন আমাদের ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, কর্মজীবনের চিন্তা অথবা কেবল নিজের মনের গভীরে চলতে থাকা নানা ভাবনা—এসবই আমাদের ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই অনুভূতিগুলো আসলে কোথা থেকে জন্মায়? এগুলি কি কেবলই বাইরের পৃথিবীর দান, নাকি এদের উৎস আমাদের অন্তরের গভীরে নিহিত?
ভারতের প্রখ্যাত দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরু ওশো ভয় ও উদ্বেগের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গভীর আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, এগুলি কোনো বাহ্যিক সমস্যা নয়, বরং আমাদের মনেরই তৈরি করা এক বিশেষ অবস্থা। ওশো কেবল এই সমস্যাগুলি শনাক্ত করার পথই দেখাননি, বরং এগুলি থেকে মুক্তি লাভের গভীর ও ব্যবহারিক উপায়ও বাতলে দিয়েছেন। আসুন, ওশো’র দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝি কেন ভয় ও উদ্বেগ তৈরি হয় এবং আমরা কীভাবে এগুলি থেকে মুক্ত হতে পারি।
ওশো’র দৃষ্টিতে ভয় ও উদ্বেগ: মনেরই সৃষ্টি

ওশো’র মতে, ভয় ও উদ্বেগ আমাদের মনেরই এক খেলা মাত্র। এই দুটি অনুভূতি সরাসরি আমাদের বর্তমান মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভবিষ্যতে বাস করার প্রবণতার সঙ্গে জড়িত।
ভয়: ভবিষ্যতের কাল্পনিক কাহিনি
ওশো বলেন, “ভয় সবসময় ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।” যা এখনো ঘটেনি, যা হয়তো কখনোই ঘটবে না—আমাদের মন কেবল তারই কল্পনা করে ভয় তৈরি করে ফেলে। এটি মনের এমন এক কাহিনি যা ‘যদি এমনটা হয়?’—এই ধরনের কাল্পনিক প্রশ্নের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ওশো’র কাছে, ভয় এক কাল্পনিক শত্রু, যাকে আমরা নিজেদের চিন্তাভাবনা দিয়ে তৈরি করি।
উদ্বেগ: ভয়েরই দীর্ঘস্থায়ী রূপ
ওশো ব্যাখ্যা করেন যে, উদ্বেগ ভয় থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং এটি ভয়েরই একটি দীর্ঘ ও স্থায়ী রূপ। যেখানে ভয় হঠাৎ করে আসে এবং চলে যায়, সেখানে উদ্বেগ অনবরত চলতে থাকে। যখন আমরা ক্রমাগত ভবিষ্যতের নানা জটিলতায় আটকে থাকি এবং বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, তখন উদ্বেগ আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মন অবিরাম সমস্যা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবতে থাকে, যদিও সেগুলি বাস্তবে উপস্থিত না-ও থাকতে পারে।
ভয় ও উদ্বেগের মূল কারণ: ওশো’র অন্তর্দৃষ্টি
ওশো ভয় ও উদ্বেগের কিছু গভীর কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. বর্তমান থেকে পলায়ন
এটি ওশো’র দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। তাঁর মতে, “যেখানে বর্তমান আছে, সেখানে ভয় বা উদ্বেগ নেই।” আমাদের মন হয় অতীতে ঘুরে বেড়ায় অথবা ভবিষ্যতে ছুটে যায়। বর্তমান মুহূর্তে স্থির থাকা মনের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। যখন আমরা বর্তমান মুহূর্তকে পুরোপুরি যাপন করি না, তখন মন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে আঁকড়ে ধরে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করতে শুরু করে।
২. মননের নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছা
ওশো বলেন, মন কাজই করে জিনিসগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। যখন মন অনুভব করে যে সে ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তখন সে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে। মন সর্বদা নিরাপত্তা চায়, এবং যখন এই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় (কাল্পনিক হলেও), তখন ভয় জন্মায়।
৩. পরিচয়ের মোহ
আমরা আমাদের পরিচয়কে শরীর, সম্পর্ক, সম্পত্তি এবং কর্মজীবনের সঙ্গে জুড়ে দিই। যখন মনে হয় যে এর কোনোটিই হারিয়ে যেতে পারে, তখন ভয় তৈরি হয়। ওশো’র মতে, এটি ‘অহং’-এর ভয়—নিজের তৈরি করা ‘আমি’-কে হারানোর ভয়।
৪. মৃত্যু ও অনিশ্চয়তার ভয়
ভয়ের সবচেয়ে গভীর উৎস হলো মৃত্যুভয়। আমরা সবাই জানি যে আমরা নশ্বর, কিন্তু আমাদের মন এই সত্যকে স্বীকার করতে চায় না। মৃত্যুর অনিশ্চয়তা এবং জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা আমাদের ভেতর থেকে ক্রমাগত ভয় দেখায়। এই অস্তিত্বগত ভয় প্রায়শই অসুস্থতা বা একাকীত্বের ভয় হিসেবে প্রকাশ পায়।
৫. সামাজিক প্রত্যাশা
ছোটবেলা থেকেই সমাজ আমাদের নির্দিষ্ট কিছু উপায়ে চিন্তা ও অনুভব করার জন্য তৈরি করে। সফল হওয়া, অন্যের চেয়ে ভালো হওয়া, ভুল না করা—এই প্রত্যাশাগুলি আমাদের মনে ব্যর্থতা, অস্বীকৃতি এবং অপর্যাপ্ততার ভয় তৈরি করে, যা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়ায়।
ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্তির ওশো’র পথ

ওশো কেবল সমস্যার কথাই বলেননি, বরং সেগুলি থেকে বেরিয়ে আসার গভীর ও ব্যবহারিক সমাধানও দিয়েছেন।
১. বর্তমানে বাঁচা
ওশো’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো ‘বর্তমানে বাঁচা’। এর অর্থ হলো আপনার মনোযোগকে পুরোপুরি সেই মুহূর্তে কেন্দ্রীভূত করা যেখানে আপনি এখন আছেন। আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন, আপনার চারপাশের শব্দ শুনুন। যখন আপনি সম্পূর্ণভাবে বর্তমানে থাকেন, তখন মনের কাছে ভবিষ্যতের কাল্পনিক কাহিনি তৈরি করার কোনো সুযোগ থাকে না।
২. সাক্ষী ভাব
ওশো আমাদের নিজেদের চিন্তা ও অনুভূতির ‘সাক্ষী’ হতে উৎসাহিত করেন। এর মানে হলো, আপনার মনে আসা ভয় বা উদ্বেগের চিন্তাগুলিকে কেবল দেখুন, সেগুলির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবেন না বা বিচার করবেন না। আপনি কেবল একজন দর্শক, যিনি নিজের মানসিক প্রক্রিয়াগুলি দেখছেন। যখন আপনি কেবল দেখতে থাকেন, তখন সেগুলির উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে শুরু করে।
৩. গ্রহণ ও সমর্পণ
ভয় ও উদ্বেগ প্রায়শই জিনিসগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার আমাদের ইচ্ছা থেকে জন্মায়। ওশো শেখান যে আমাদের জীবনের অনিশ্চয়তাগুলিকে গ্রহণ করতে শিখতে হবে। যা আছে, তাকে তেমনই গ্রহণ করুন। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা ছেড়ে দিন এবং অস্তিত্বের প্রবাহের প্রতি সমর্পিত হন। এই সমর্পণ আমাদের গভীর শান্তি ও আস্থা দেয়।
৪. ধ্যান ও নীরবতা
ওশো বিভিন্ন ধ্যান পদ্ধতির উপর জোর দিয়েছেন, যা মনকে শান্ত করতে এবং আমাদের ভেতরের কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। সক্রিয় ধ্যান মনে জমে থাকা অনুভূতিগুলিকে বের করে আনতে সাহায্য করে, অন্যদিকে নিষ্ক্রিয় ধ্যান আপনাকে বর্তমানে স্থির করে। নীরবতায় বসে নিজের ভেতরের কোলাহল শোনাও মনকে শান্ত করার একটি শক্তিশালী উপায়।
৫. প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ
ওশো আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে এবং জীবনকে একটি উৎসব হিসেবে যাপন করতে উৎসাহিত করেন। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, নাচ, গান এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পূর্ণভাবে যাপন করা—এই সব উপায় আমাদের মনোজাগতিক জাল থেকে বের করে এনে জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে যুক্ত করে।
উপসংহার
ওশো’র মতে, ভয় ও উদ্বেগ কোনো বাহ্যিক বিপর্যয় নয়, বরং আমাদের মনেরই তৈরি করা এক মায়াবী অবস্থা। এগুলি ভবিষ্যতের কল্পনা, বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ‘আমি’-র মোহ থেকে জন্মায়। কিন্তু আশার কথা হলো, এগুলি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে বেঁচে থাকা, নিজের চিন্তার সাক্ষী হওয়া, গ্রহণ এবং ধ্যানের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভেতরের শান্তি পুনরায় খুঁজে পেতে পারি। ভয় ও উদ্বেগ যে কেবল মনেরই খেলা—এই উপলব্ধি আমাদের সেগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করতে এবং সেগুলি থেকে মুক্ত হওয়ার প্রথম সোপান। নিজের গভীরে তাকিয়ে, আমরা কেবল ভয় ও উদ্বেগ থেকেই মুক্ত হতে পারি না, বরং আরও সচেতন, আনন্দময় এবং অর্থপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারি।
সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQs)
ওশো’র মতে ভয় ও উদ্বেগের প্রধান কারণ কী?
ওশো’র মতে, ভয় ও উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো বর্তমান মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভবিষ্যতে বাস করা, মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এবং নিজের তৈরি করা ‘আমি’ বা পরিচয়ের প্রতি অতিরিক্ত মোহ।
বর্তমান মুহূর্তে বাঁচা বলতে কী বোঝায়?
বর্তমান মুহূর্তে বাঁচা মানে হলো আপনার সমস্ত মনোযোগ ও সচেতনতা কেবল সেই নির্দিষ্ট সময়ে কেন্দ্রীভূত করা যেখানে আপনি এখন আছেন। এটি অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা না করে কেবল বর্তমানের অভিজ্ঞতাকে যাপন করা।
সাক্ষী ভাব কীভাবে ভয় কমাতে সাহায্য করে?
সাক্ষী ভাব মানে হলো নিজের চিন্তা ও অনুভূতিগুলিকে বিচার না করে কেবল একজন দর্শকের মতো পর্যবেক্ষণ করা। যখন আপনি আপনার ভয় বা উদ্বেগের চিন্তাগুলিকে কেবল দেখতে থাকেন, তখন সেগুলির উপর আপনার মানসিক প্রভাব কমে যায় এবং সেগুলি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ধ্যান কি ভয় ও উদ্বেগ দূর করতে পারে?
হ্যাঁ, ওশো’র মতে ধ্যান মনকে শান্ত করতে, বর্তমান মুহূর্তে স্থির থাকতে এবং ভেতরের কোলাহল কমাতে সাহায্য করে, যা ভয় ও উদ্বেগ থেকে মুক্তি লাভে অত্যন্ত কার্যকর।
ওশো’র শিক্ষা কি আজকের জীবনে প্রাসঙ্গিক?
ওশো’র শিক্ষা, বিশেষ করে বর্তমান মুহূর্তে বাঁচা, মনকে পর্যবেক্ষণ করা এবং জীবনের প্রতি গভীর গ্রহণ—এগুলি আজকের দ্রুত ও চাপপূর্ণ জীবনে মানসিক শান্তি ও সুস্থতা অর্জনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।