ঘুটনের ব্যথায় হাঁটা কি জরুরি?
অনেকেই মনে করেন যে ঘুটনে ব্যথা শুরু হলে সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া উচিত। কিন্তু এটি সবসময় সঠিক নয়। জয়েন্টের সুস্থতার জন্য নিয়মিত নড়াচড়া জরুরি। যখন আপনি হাঁটেন, তখন ঘুটনের ভেতরের সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বা প্রাকৃতিক লুব্রিকেন্ট পুরো জয়েন্টে ছড়িয়ে পড়ে, যা কার্টিলেজকে পুষ্টি জোগায়। হাঁটা বন্ধ করে দিলে জয়েন্ট আরও শক্ত হয়ে যেতে পারে।
তবে, কোথায় থামতে হবে তা জানা জরুরি। হালকা টান বা ওয়ার্ম-আপের পর কমে যাওয়া ব্যথা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু যদি হাঁটার সময় হঠাৎ তীব্র ব্যথা হয়, ঘুটনে আটকে যায় বা শরীরের ভার বহন করতে না পারে, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীরের বিশ্রাম প্রয়োজন। এই অবস্থায় জোর করে হাঁটা ক্ষতিকর হতে পারে।
ভুল জুতো পরে হাঁটা: ঘুটনের জন্য বড় বিপদ
অনেকেই হাঁটার জন্য পুরনো স্লিপার, পাতলা তলার ক্যানভাস শু বা ছেঁড়া চটি পরে বেরিয়ে পড়েন। এটি আপনার ঘুটনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যখন আপনার পা মাটিতে পড়ে, তখন একটি ঝাঁকি তৈরি হয়। যদি আপনার জুতো সেই ঝাঁকি শোষণ করতে না পারে, তবে সেই ঝাঁকি সরাসরি ঘুটনে এবং গোড়ালিতে গিয়ে লাগে।
শক্ত মাটিতে বা কংক্রিটের রাস্তায় কুশন ছাড়া জুতো পরে হাঁটলে ঘুটনের ভেতরের কার্টিলেজ দ্রুত ক্ষয় হয়। সবসময় এমন রানিং বা ওয়াকিং শু বেছে নিন যার সামনের দিকে আঙুল নাড়াচাড়ার জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকে এবং গোড়ালির নিচে নরম কুশন থাকে। জুতোর আয়ুষ্কাল সম্পর্কেও সচেতন থাকা উচিত; প্রতি ৫০০-৬০০ কিলোমিটার হাঁটার পর জুতো তার কুশনিং ক্ষমতা হারায় এবং এটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
হাঁটার জন্য সঠিক জায়গা নির্বাচন
আপনি কোথায় হাঁটছেন, তার ওপর নির্ভর করে আপনার ঘুটনে কতদিন সুস্থ থাকবে। পাকা রাস্তা বা সিমেন্টের ফুটপাত খুব শক্ত হয়। এই ধরনের রাস্তায় নিয়মিত হাঁটলে জয়েন্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এর পরিবর্তে, পার্কের ঘাস বা কাঁচা মাটির রাস্তা আপনার ঘুটনের জন্য অনেক বেশি উপকারী।
এছাড়াও, ঢালু রাস্তায় বা সিঁড়িতে হাঁটা এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, নিচে নামার সময় ঘুটনের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে। ট্রেডমিল ব্যবহার করলে, ইনক্লাইন (ঢাল) একদম ০% রাখুন অথবা সমতল ট্র্যাক ব্যবহার করুন।
হাঁটার আগে ও পরে করণীয়
বেশিরভাগ মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়েই দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করে দেন। ঠান্ডা এবং শক্ত পেশীতে হঠাৎ চাপ দিলে লিগামেন্টে টান লাগতে পারে। হাঁটার আগে অন্তত ৫ মিনিট হালকা ওয়ার্ম-আপ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে পায়ের পেশী শিথিল হয় এবং জয়েন্টগুলি প্রস্তুত থাকে।
একইভাবে, হাঁটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বসে পড়া উচিত নয়। ২-৩ মিনিট হালকা গতিতে হেঁটে শরীরকে ‘কুল ডাউন’ হতে দিন। হাঁটার পর ঘুটনে হালকা গরম ভাব বা ফোলা দেখা দিলে, ১০-১৫ মিনিটের জন্য বরফ সেঁক দিন। বরফ সেঁক জয়েন্টের ভেতরের প্রদাহ কমাতে এবং ব্যথা বাড়াতে বাধা দেয়।
তথ্য: হাঁটার সময় আমাদের ঘুটনের ওপর শরীরের ওজনের প্রায় ৩ থেকে ৪ গুণ চাপ পড়ে।
হাঁটার সময় অঙ্গবিন্যাস (Posture) ও গতির সঠিক ভারসাম্য
আপনি কি হাঁটার সময় পা মাটিতে আছড়ে ফেলেন? অথবা খুব লম্বা লম্বা পা ফেলেন? যদি তাই হয়, তবে আপনার হাঁটার ধরণ পরিবর্তন করুন। লম্বা পা ফেললে গোড়ালিতে অতিরিক্ত ঝাঁকি লাগে যা সরাসরি ঘুটনের বাটি (Patella)-কে প্রভাবিত করে। এর পরিবর্তে ছোট এবং নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপে হাঁটুন। হাঁটার সময় প্রথমে গোড়ালি মাটিতে স্পর্শ করবে এবং তারপর পায়ের পাতা দিয়ে ভর দিন।
গতির ক্ষেত্রে, অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করবেন না। আপনার সঙ্গী খুব দ্রুত হাঁটলে, তার সাথে তাল মিলিয়ে নিজের গতি বাড়াবেন না। ঘুটনের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য মাঝারি এবং আরামদায়ক গতিই সবচেয়ে ভালো। পেটের পেশী সামান্য শক্ত রেখে এবং মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাঁটলে শরীরের ওজন দুই পায়ে সমানভাবে বণ্টিত হয়।
উরুর পেশী শক্তিশালী করা: ঘুটনের ব্যথার স্থায়ী সমাধান
ঘুটনের জয়েন্ট একা কাজ করে না। একে সাপোর্ট দেয় উরুর সামনের দিকের পেশী (Quadriceps) এবং পিছনের পেশী (Hamstrings)। যদি আপনার উরুর পেশী দুর্বল হয়, তবে হাঁটার পুরো চাপ সরাসরি হাড় এবং কার্টিলেজের ওপর পড়ে। তাই শুধু হাঁটা যথেষ্ট নয়, পেশী শক্তিশালী করাও সমান জরুরি।
সোজা হয়ে শুয়ে পা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত তোলা (Straight Leg Raise) একটি সহজ এবং কার্যকর ব্যায়াম। এটি নিয়মিত করলে উরুর পেশী শক্তিশালী হয়। যখন আপনার পেশী শক্তিশালী হবে, তখন তারা একটি প্রাকৃতিক শক অ্যাবজরবারের মতো কাজ করবে এবং হাঁটার সময় আপনার ঘুটনকে প্রতিটি ঝাঁকি থেকে রক্ষা করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
প্রশ্ন: ঘুটনের ব্যথায় কি রোজ হাঁটা উচিত?
উত্তর: হ্যাঁ, হাঁটা জয়েন্টের জন্য উপকারী। তবে ব্যথা বেশি হলে বা ফোলা থাকলে বিশ্রাম নিন। প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট হালকা ওয়ার্ম-আপ সহ নরম জায়গায় হাঁটা সবচেয়ে নিরাপদ।
প্রশ্ন: ঘুটনের ব্যথায় গরম সেঁক না বরফ সেঁক কোনটি ভালো?
উত্তর: হাঁটার পর ফোলা বা জ্বালা অনুভব করলে বরফ সেঁক ব্যবহার করুন। যদি পুরনো ব্যথা এবং জড়তা অনুভব করেন, তবে হাঁটার আগে হালকা গরম সেঁক দেওয়া ভালো।
প্রশ্ন: হাঁটার সময় নি-ক্যাপ (Knee Cap) পরা কি ঠিক?
উত্তর: হ্যাঁ, হাঁটার সময় নি-ক্যাপ বা ব্রেস পরলে জয়েন্টগুলি অতিরিক্ত সাপোর্ট পায় এবং হাঁটায় স্থিতিশীলতা আসে। তবে এটি সারাদিন পরে থাকা উচিত নয়, কারণ এতে পেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন: কোন ধরনের মাটিতে হাঁটা ঘুটনের জন্য সবচেয়ে ভালো?
উত্তর: পার্কের ঘাস, কাঁচা মাটি বা সিন্থেটিক ওয়াকিং ট্র্যাক সবচেয়ে ভালো। সিমেন্টের রাস্তা এবং ডামারের রাস্তায় হাঁটা এড়িয়ে চলা উচিত কারণ এগুলি খুব শক্ত হয়।