পরিবেশ-বান্ধব গণেশ মূর্তি কেনা ও চেনার সহজ উপায়
গণেশ চতুর্থী বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব। এই সময় চারিদিকে গণেশ মূর্তির পসরা বসে যায়। কিন্তু সব মূর্তিই কি পরিবেশ-বান্ধব? অনেক সময় উজ্জ্বল রঙ ও চকচকে স্টিকার দেখে আমরা প্লাস্টার অফ প্যারিস (POP) নির্মিত মূর্তি কিনে ফেলি, যা আসলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই POP মূর্তিগুলি বিসর্জনের পর নদী বা পুকুরের জলকে দূষিত করে। আপনি যদি পরিবেশ এবং আপনার ভক্তি দুটোই রক্ষা করতে চান, তবে মূর্তি কেনার আগে কিছু বিষয় জেনে রাখা দরকার।
২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী কবে?
২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী পালিত হবে ১৪ই সেপ্টেম্বর, সোমবার।
কেন পরিবেশ-বান্ধব গণেশ মূর্তি জরুরি?
আমাদের নদী ও পুকুরগুলি ইতিমধ্যেই নানা কারণে দূষিত। POP মূর্তি জলে সহজে মেশে না। এর উপর থাকা রাসায়নিক রং ও অন্যান্য উপাদান জলকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। অন্যদিকে, शाडू মাটি (প্রাকৃতিক কাদামাটি) বা গোবর-মাটির মূর্তি সহজেই জলে মিশে যায় এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। তাই অনেক পৌরসভা ও পরিবেশ সংগঠন এই ধরনের মূর্তি ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে।
‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ স্টিকার কি যথেষ্ট?
অনেক বিক্রেতা POP মূর্তির উপর মাটির একটি পাতলা আস্তরণ দিয়ে সেটিকে ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ বলে বিক্রি করেন। তাই শুধুমাত্র স্টিকারের উপর নির্ভর না করে, মূর্তি চেনার কিছু সহজ উপায় জেনে নিন।
शाडू মাটির গণেশ মূর্তি চেনার উপায়

দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করাই যথেষ্ট নয়, নিজেকেই পরীক্ষা করে নিতে হবে।
- ওজন: একই আকারের शाडू মাটির মূর্তি POP মূর্তির চেয়ে সাধারণত বেশি ভারী হয়, কারণ মাটির ঘনত্ব বেশি।
- স্পর্শ ও পৃষ্ঠতল: शाडू মাটির মূর্তির পৃষ্ঠতল একটু খসখসে বা মাটির মতো দানাদার হয়। POP মূর্তি খুব মসৃণ ও চকচকে হয়, যা প্লাস্টিকের খেলনার মতো দেখতে লাগে।
- খরুচে পরীক্ষা (সাবধানে): মূর্তির কোণায় নখ বা পয়সা দিয়ে হালকা আঁচড় কাটলে, মাটির মূর্তি থেকে মাটির গুঁড়ো বের হতে পারে, কিন্তু POP থেকে সাদা পাউডারের মতো ভাঙা অংশ পড়বে।
- জল পরীক্ষা: মূর্তির নিচের দিকে বা কোনো লুকানো অংশে এক ফোঁটা জল দিন। शाडू মাটি দ্রুত জল শোষণ করে গাঢ় বা নরম হয়ে যায়। POP-এর উপর জল মুক্তোর মতো জমে থাকে এবং শুকাতে অনেক সময় নেয়।
- গন্ধ: কাঁচা মাটির হালকা গন্ধ शाडू মূর্তিতে পাওয়া যেতে পারে। POP মূর্তিতে প্রায়শই রং বা রাসায়নিকের গন্ধ থাকে।
- রঙ: প্রাকৃতিক মাটির রং (যেমন – হালকা বাদামী, লালচে) বা হালকা প্রাকৃতিক রং দেওয়া মূর্তি ভালো। খুব বেশি উজ্জ্বল, মেটালিক রং, প্লাস্টিকের মতো চোখ বা গ্লিটার ব্যবহার করা হলে তা POP বা মিশ্র উপাদানের ইঙ্গিত দেয়।
- বিক্রেতার জিজ্ঞাসা: বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করুন, রং ছাড়া মূর্তিটি জলে কতক্ষণ গুলে যায়। আসল বিক্রেতারা शाडू মাটির ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর দেবেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: আসল शाडू মাটির মূর্তি সাধারণত একটু বেশি ছিদ্রযুক্ত (porous) হয় এবং জল পেলে দ্রুত নরম হয়ে যায়। অন্যদিকে, POP মূর্তি হালকা, মসৃণ এবং জলে সহজে গুলে যেতে চায় না।
POP (প্লাস্টার অফ প্যারিস) মূর্তি কোথায় কিনবেন না এবং কী জিজ্ঞাসা করবেন
POP মূর্তি সাধারণত সস্তা ও চকচকে হওয়ায় ভিড়ের মধ্যে বা কম দামি দোকানে বেশি পাওয়া যায়। যদি বিক্রেতা বলেন যে এটি ‘মাটিই’, কিন্তু মূর্তিটি হালকা ও মসৃণ মনে হয়, তবে আবার জিজ্ঞাসা করুন – এটি কি সত্যিই शाडू মাটি নাকি POP?
লিখিত বা মৌখিক গ্যারান্টি নিন। অনেক শহরে পৌরসভা বা সমবায় সমিতি ‘ইকো স্টল’ লাগায়, সেখান থেকে কেনা নিরাপদ। অনলাইন কেনার সময় রিভিউ এবং উপাদানের বিবরণ (যেমন – ‘material: shadu clay’) ভালোভাবে দেখে নিন। শুধু ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ লেখা যথেষ্ট নয়।
রঙের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করুন: লেড বা ক্ষতিকারক রাসায়নিক যুক্ত উজ্জ্বল রং জলকে দূষিত করতে পারে। প্রাকৃতিক গেরু, হলুদ বা জল-ভিত্তিক হালকা রং ব্যবহার করা হয়েছে কিনা জেনে নিন। মূর্তির চোখ, মুকুট যদি আলাদা প্লাস্টিকের হয়, তবে বিসর্জনের আগে সেগুলি খুলে ফেলুন।
মনে রাখবেন: দামি মূর্তি মানেই পরিবেশ-বান্ধব নয়। অনেক সময় সাধারণ, কম দামি शाडू মাটির মূর্তিই সেরা বিকল্প হয়।
পরিবেশ-বান্ধব উপায়ে গণেশ বিসর্জন

পরিবেশ-বান্ধব মূর্তির আসল পরীক্ষা হয় বিসর্জনের সময়। নদী বা সমুদ্রে মূর্তি বিসর্জন পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
- বাড়িতে বিসর্জন: একটি বড় টবে বা বালতিতে জল নিয়ে তাতে মূর্তিটি রাখুন। মন্ত্র বা আরতি সহকারে মূর্তিটিকে জলে গুলে যেতে দিন। এই জল পরে বাগানের গাছে ব্যবহার করতে পারেন (যদি রং প্রাকৃতিক হয়)।
- কৃত্রিম জলাশয়: অনেক সোসাইটি বা পৌরসভা কৃত্রিম জলাশয় (artificial pond) তৈরি করে। সেখানে বিসর্জন দেওয়া খোলা জলাশয়ের চেয়ে অনেক ভালো।
- সাজসজ্জা অপসারণ: বিসর্জনের আগে মূর্তির সাথে থাকা ফুল, প্লাস্টিকের সাজসজ্জা, থার্মোকল, তার ইত্যাদি সব খুলে ফেলুন। শুধুমাত্র মাটির মূর্তিটি জলে দিন।
- POP মূর্তি হলে: যদি ভুলবশত POP মূর্তি কিনে ফেলেন, তবে সেটি কখনোই খোলা জলে বিসর্জন দেবেন না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা নির্দিষ্ট সংগ্রহস্থলে (collection point) জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
বিসর্জনের সময়সূচী: গণেশ চতুর্থী ২০২৬-এর পর ১.৫ দিন, ৩ দিন, ৫ দিন, ৭ দিন বা ১০ দিন পর বিসর্জন দেওয়া যায়। মূল বিসর্জন (অনন্ত চতুর্দশী) ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬। আপনার স্থানীয় পঞ্জিকা দেখে সঠিক সময় জেনে নিন।
বাড়িতে গণেশ মূর্তি স্থাপন ও যত্নের টিপস
शाडू মাটির মূর্তি আর্দ্রতার প্রতি সংবেদনশীল। মূর্তি স্থাপনের আগে একটি শুকনো ও পরিষ্কার জায়গা বেছে নিন। সরাসরি এসির ঠান্ডা হাওয়া বা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে রাখবেন না।
মূর্তিতে হালকা ফাটল দেখা দিলে চিন্তিত হবেন না, এটি মাটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে। তবে বড় ভাঙন হলে সাবধানে প্রতিস্থাপন করুন। পূজার সময় জল দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন যেন মূর্তির নিচে জল জমে না থাকে।
সাজসজ্জা হালকা রাখুন। অতিরিক্ত আলো বা ভেজা ফুলের স্তূপ মাটির ক্ষতি করতে পারে। থার্মোকলের বদলে কাপড়, কলাপাতা বা কাগজের সজ্জা ব্যবহার করুন।
গণেশ মূর্তি কেনাকাটার চেকলিস্ট ২০২৬
- উপাদান জিজ্ঞাসা করুন: शाडू মাটি, সাধারণ মাটি বা গোবর-মাটি। POP বা প্লাস্টিক নয়।
- ওজন ও পৃষ্ঠতল পরীক্ষা করুন।
- এক ফোঁটা জল দিয়ে পরীক্ষা করুন।
- রং প্রাকৃতিক ও হালকা হওয়া উচিত।
- প্লাস্টিকের চোখ বা মুকুট থাকলে খুলে ফেলার যোগ্য কিনা দেখুন।
- মূর্তির আকার আপনার বাড়ি ও বিসর্জনের সুবিধার সাথে মানানসই কিনা।
- যদি সম্ভব হয়, বিল বা দোকানের নাম লিখে রাখুন।
- ভিড় এড়াতে গণেশ চতুর্থীর কয়েকদিন আগে কিনুন।
এই চেকলিস্টটি ফোনে সেভ করে রাখতে পারেন। মনে রাখবেন, পরিবেশ-বান্ধব গণেশ মূর্তি কেনা একটি ফ্যাশন নয়, বরং জল ও মাটির প্রতি আমাদের কর্তব্য।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. পরিবেশ-বান্ধব গণেশ মূর্তি কীভাবে চিনব?
शाडू মাটির মূর্তি সাধারণত ভারী ও দানাদার হয়, আর POP মূর্তি হালকা ও মসৃণ। জল পরীক্ষা, স্পর্শ এবং বিক্রেতার সাথে কথা বলে আপনি এটি চিনতে পারবেন। শুধু ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ স্টিকারে ভরসা করবেন না।
২. शाडू মাটি ও প্লাস্টার অফ প্যারিসের মধ্যে পার্থক্য কী?
शाडू হল প্রাকৃতিক কাদামাটি যা জলে মিশে যায়। প্লাস্টার অফ প্যারিস (POP) জলে সহজে মেশে না এবং জলজ পরিবেশের ক্ষতি করে।
৩. বাড়িতে পরিবেশ-বান্ধব উপায়ে গণেশ বিসর্জন কীভাবে করব?
মূর্তি থেকে সব সাজসজ্জা খুলে ফেলুন। একটি বালতি বা টবে জল নিয়ে তাতে মূর্তিটি রাখুন। মূর্তি গলে গেলে সেই জল গাছে ব্যবহার করুন। অথবা স্থানীয়ভাবে তৈরি কৃত্রিম জলাশয়ে বিসর্জন দিন।
৪. ২০২৬ সালে গণেশ চতুর্থী কবে এবং মূল বিসর্জন কবে?
গণেশ চতুর্থী ২০২৬ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর, সোমবার। মূল বিসর্জন (অনন্ত চতুর্দশী) ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬। এছাড়া ১৫, ১৬, ১৮, ২০ সেপ্টেম্বরও বিসর্জন দেওয়া যেতে পারে।
৫. অতিরিক্ত চকচকে রং দেওয়া মূর্তি কি কেনা যাবে?
অতিরিক্ত চকচকে বা রাসায়নিক রংযুক্ত মূর্তি এড়িয়ে চলাই ভালো। হালকা, প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা মূর্তি পরিবেশের জন্য নিরাপদ। বিসর্জনের আগে সব প্লাস্টিক বা নন-বায়োডিগ্রেডেবল জিনিস খুলে ফেলুন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই তথ্যগুলি সাধারণ জ্ঞানের জন্য দেওয়া হয়েছে। মূর্তি কেনা, বিসর্জন এবং পূজার সময়সূচী আপনার স্থানীয় নিয়ম ও পঞ্জিকা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। কেনার আগে বিশ্বস্ত বিক্রেতা এবং স্থানীয় নিয়ম জেনে নিন।