PNB কেলেঙ্কারি: নীরব মোদীর ১৪,০০০ কোটি টাকার জালিয়াতি, কীভাবে ঘটল?
ভারতের আর্থিক ইতিহাসে কিছু নাম আছে যা কেলেঙ্কারি এবং জালিয়াতির সমার্থক হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল নীরব মোদী, যিনি পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (PNB)-কে প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ ছিল না, বরং এটি ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটি এবং দুর্নীতির একটি তিক্ত সত্যও উন্মোচন করেছিল। এই নিবন্ধে, আমরা এই জটিল কেলেঙ্কারিটি সহজ বাংলায় ধাপে ধাপে বুঝব, যাতে আপনি জানতে পারেন কীভাবে একজন ব্যক্তি এত বড় একটি ব্যাংককে এত বছর ধরে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
PNB কেলেঙ্কারি কী ছিল? একটি বিস্তারিত আলোচনা
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (PNB) ভারতের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম সরকারি ব্যাংক। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, PNB প্রকাশ করে যে তাদের মুম্বাইয়ের একটি শাখায় প্রায় সাত বছর ধরে একটি বড় জালিয়াতি চলছিল। এই জালিয়াতির মূল হোতা ছিলেন হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদী, যার সাথে তার মামা মেहुल চোকসি এবং PNB-র কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীও জড়িত ছিল। এই কেলেঙ্কারিটি মূলত “লেটার অফ আন্ডারটেকিং” (Letter of Undertaking – LOU) নামক একটি ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থার অপব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়েছিল।
- কেলেঙ্কারির পরিমাণ: ₹১৪,০০০ কোটি টাকার বেশি।
- মূল অভিযুক্ত: নীরব মোদী, মেहुल চোকসি, এবং PNB-র কিছু কর্মকর্তা।
- মূল হাতিয়ার: ভুয়া লেটার অফ আন্ডারটেকিং (LOU) এবং SWIFT সিস্টেমের অপব্যবহার।
- প্রভাব: এটি ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার উপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে তাদের নীতি পর্যালোচনা করতে বাধ্য করে।
কেলেঙ্কারির মূল হাতিয়ার: লেটার অফ আন্ডারটেকিং (LOU) কী?
কেলেঙ্কারিটি বোঝার জন্য LOU বোঝা অত্যন্ত জরুরি। LOU হল এক ধরনের ব্যাংক গ্যারান্টি, যা একটি ব্যাংক অন্য ব্যাংককে জারি করে। এটি প্রায়শই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে যখন কোনও আমদানিকারক বিদেশ থেকে পণ্য কেনেন।
কীভাবে কাজ করে (বৈধভাবে):
- একজন আমদানিকারক (যেমন নীরব মোদীর কোম্পানি) তার দেশের ব্যাংকের (PNB) সাথে যোগাযোগ করেন।
- আমদানিকারক PNB-কে বলেন যে তার বিদেশে পণ্য কেনার জন্য ঋণের প্রয়োজন।
- PNB আমদানিকারকের বিশ্বাসযোগ্যতা (creditworthiness) পরীক্ষা করে এবং কিছু জামানত (collateral) রাখে।
- তারপর PNB, আমদানিকারকের পক্ষে কোনও বিদেশী ব্যাংককে (বা কোনও ভারতীয় ব্যাংকের বিদেশী শাখাকে) LOU জারি করে।
- এই LOU-তে PNB গ্যারান্টি দেয় যে, যদি আমদানিকারক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তবে PNB সেই ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে।
- বিদেশী ব্যাংক এই LOU-এর ভিত্তিতে আমদানিকারককে ‘বায়ার ক্রেডিট’ (Buyer’s Credit) হিসাবে কম সুদে স্বল্পমেয়াদী ঋণ দেয়।
- যখন ঋণের মেয়াদ শেষ হয়, তখন আমদানিকারক PNB-কে অর্থ প্রদান করে, এবং PNB বিদেশী ব্যাংককে পরিশোধ করে।
এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সহজ করে তোলে, কিন্তু নীরব মোদী এই বিশ্বস্ত ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছিলেন।
নীরব মোদী LOU-এর অপব্যবহার কীভাবে করেছিলেন? (ধাপে ধাপে প্রকাশ)
এই কেলেঙ্কারি বহু বছর ধরে চলতে থাকার কারণ ছিল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের জড়িত থাকা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু বড় ত্রুটির সুযোগ নেওয়া।
১. ব্যাংক কর্মচারীদের জড়িত থাকা এবং SWIFT-এর অপব্যবহার
কেলেঙ্কারির শুরু হয়েছিল PNB-র কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী, বিশেষ করে উপ-ব্যবস্থাপক গোকুলনাথ শেট্টির জড়িত থাকার মাধ্যমে। এই কর্মচারীরা নীরব মোদী এবং মেहुल চোকসির কোম্পানিগুলির জন্য ভুয়া LOU জারি করেছিলেন। তারা ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে (Finacle) এই LOU-গুলির কোনও এন্ট্রি করেননি। পরিবর্তে, তারা সরাসরি SWIFT (Society for Worldwide Interbank Financial Telecommunication) সিস্টেম ব্যবহার করেছিলেন। SWIFT হল একটি বিশ্বব্যাপী মেসেজিং নেটওয়ার্ক যা ব্যাংকগুলি নিরাপদে আর্থিক লেনদেনের তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার করে। Finacle এবং SWIFT-এর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল।
২. ভুয়া LOU জারি করা
গোকুলনাথ শেট্টি এবং তার সঙ্গীরা নীরব মোদীর কোম্পানিগুলির জন্য কোনও জামানত বা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই শত শত LOU জারি করেছিলেন। যেহেতু এই LOU-গুলি Finacle-এ নথিভুক্ত ছিল না, তাই PNB-র সিস্টেমে এটি কখনও দেখা যায়নি যে ব্যাংক এত বড় অঙ্কের গ্যারান্টি দিয়েছে। ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
৩. বিদেশী শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ
এই ভুয়া LOU-গুলির ব্যবহার করে নীরব মোদীর কোম্পানিগুলি PNB-র হংকং, দুবাই, বাহরাইন, মরিশাসের মতো বিদেশী শাখা বা অন্যান্য ভারতীয় ব্যাংকের বিদেশী শাখা থেকে ‘বায়ার ক্রেডিট’ হিসাবে স্বল্পমেয়াদী ঋণ গ্রহণ করেছিল। বিদেশী ব্যাংকগুলি LOU-কে PNB-র আনুষ্ঠানিক গ্যারান্টি হিসাবে বিবেচনা করেছিল এবং তারা জানত না যে এই LOU-গুলি ভুয়াভাবে জারি করা হয়েছিল।
৪. ‘রোলওভার’ কৌশল: পুরনো ঋণ নতুন ঋণ দিয়ে শোধ করা
এটি কেলেঙ্কারির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল যা এটিকে এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল। যখন একটি LOU-এর মেয়াদ শেষ হতে যেত, তখন নীরব মোদীর সহযোগীরা একটি নতুন ভুয়া LOU জারি করাতেন। এই নতুন LOU থেকে প্রাপ্ত অর্থ পুরনো LOU-এর ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যবহার করা হত। এটি একটি ‘পঞ্জি স্কিম’-এর মতো কাজ করছিল, যেখানে নতুন ঋণ দিয়ে পুরনো ঋণ শোধ করা হচ্ছিল। যতক্ষণ এই ‘রোলওভার’ চলছিল, ততক্ষণ কেউ সন্দেহ করেনি।
৫. অর্থের তছরুপ এবং শেল কোম্পানি
এই জালিয়াতি থেকে প্রাপ্ত বেশিরভাগ অর্থ নীরব মোদী এবং মেहुल চোকসি তাদের বিভিন্ন শেল কোম্পানি (কাগজের কোম্পানি)-র মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল দামি গয়না কেনা, বিদেশে সম্পত্তি তৈরি করা এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করার জন্য। এইভাবে, PNB থেকে নেওয়া অর্থ ধীরে ধীরে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
কেলেঙ্কারি কীভাবে ফাঁস হল এবং এরপর কী ঘটল?
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে, এই কেলেঙ্কারিটি ফাঁস হয় যখন PNB-র একজন নতুন কর্মচারী গোকুলনাথ শেট্টির অবসরের পর একটি LOU নবীকরণ করতে অস্বীকার করেন। এই কর্মচারী LOU জারির জন্য জামানতের দাবি করেন, যা আগে কখনও চাওয়া হয়নি। যখন নীরব মোদীর কোম্পানিগুলি PNB-র কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি LOU জারির অনুরোধ করেছিল, তখন সিস্টেমে কোনও পূর্ববর্তী রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এতে ব্যাংকে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং পুরো জালিয়াতিটি সামনে আসে।
তদন্ত ও গ্রেপ্তার:
PNB অবিলম্বে CBI (কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো)-কে অভিযোগ দায়ের করে। CBI এবং ED (প্রवर्तन সঞ্চালনা) তদন্ত শুরু করে এবং PNB-র কর্মকর্তা সহ নীরব মোদী ও মেहुल চোকসির সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়।
নীরব মোদীর পলায়ন:
কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার কয়েকদিন আগেই নীরব মোদী এবং মেहुल চোকসি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। নীরব মোদীকে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ভারত সরকার তার প্রত্যর্পণের (extradition) চেষ্টা করছে।
ব্যাংকিং খাতের উপর প্রভাব:
এই কেলেঙ্কারি ভারতীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা নষ্ট করে দেয়। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) ব্যাংকগুলিকে SWIFT এবং কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার নির্দেশ দেয় এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার উপর জোর দেয়।
এই কেলেঙ্কারি থেকে কী শিক্ষা পাওয়া গেল?
নীরব মোদী PNB কেলেঙ্কারি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ ছিল না, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল যে কীভাবে সিস্টেমের ত্রুটি এবং মানুষের লোভ বড় আকারের ক্ষতি করতে পারে।
- শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ: ব্যাংকগুলিকে তাদের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্রমাগত শক্তিশালী করতে হবে যাতে কোনও কর্মচারী সিস্টেমের অপব্যবহার করতে না পারে।
- প্রযুক্তির সমন্বয়: SWIFT-এর মতো মেসেজিং সিস্টেমগুলিকে কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের সাথে সম্পূর্ণরূপে সমন্বিত করা উচিত যাতে সমস্ত লেনদেনের রেকর্ড থাকে।
- কর্মচারীদের নজরদারি: ব্যাংক কর্মচারীদের কার্যকলাপের উপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে এবং নিয়মিতভাবে তাদের কাজের নিরীক্ষা (audit) করা উচিত।
- নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা: ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রকদের ব্যাংকগুলির নজরদারিতে আরও সক্রিয় এবং সতর্ক থাকতে হবে।
- গ্রাহক সচেতনতা: গ্রাহকদেরও তাদের ব্যাংক লেনদেন এবং ব্যাংক সম্পর্কিত কোনও অস্বাভাবিক অনুরোধ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
আপনার যা জানা উচিত
ভাই, এই নীরব মোদীর মতো কেলেঙ্কারি শুধু বড়লোকদের ব্যাপার নয়। এটি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয় যে আমাদের নিজেদের অর্থের ব্যাপারে কতটা সতর্ক থাকতে হবে। আমার পরামর্শ হল, যখনই ব্যাংক সম্পর্কিত কোনও বিষয় আসে, বিশেষ করে যদি কোনও ‘শর্টকাট’ বা ‘বিশেষ ডিল’ অফার করা হয় যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে যান। আপনার ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং যদি কোনও লেনদেন বুঝতে না পারেন তবে দ্বিধা না করে ব্যাংককে জিজ্ঞাসা করুন। মনে রাখবেন, আপনার টাকা, আপনার দায়িত্ব। যদি কোনও ব্যাংক কর্মচারী আপনাকে এমন কোনও পরামর্শ দেয় যা সিস্টেমের বিরুদ্ধে যায়, তবে অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করুন। লোভের বশে কখনও আপনার কষ্টার্জিত অর্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না।


