হরছট পূজা: পুত্রদের দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধির জন্য ব্রত ও মাহাত্ম্য
ভারতবর্ষ এমন এক দেশ যেখানে প্রতিটি উৎসবের নিজস্ব তাৎপর্য ও ঐতিহ্য রয়েছে। এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো হরছট পূজা, যা হলষষ্ঠী বা ললহি छठ নামেও পরিচিত। এই ব্রত মূলত মায়েরা তাদের সন্তানদের, বিশেষ করে পুত্রদের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির কামনায় পালন করেন। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আস্থার প্রতীকই নয়, বরং মাতৃত্বের ভালোবাসা ও ত্যাগের মহিমাকেও তুলে ধরে। হরছট উৎসব সাধারণত ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয়, যা প্রায়শই রক্ষা বন্ধনের ছয় দিন পর আসে। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই, বলদেব জি (বলরাম)-এর জন্মদিন হিসেবেও উদযাপিত হয়, যিনি হলধর নামেও পরিচিত। তাই এই দিনে লাঙল (হল) এবং দেবী ষষ্ঠীর পূজা করার বিশেষ নিয়ম রয়েছে। আসুন, এই ব্রতের মাহাত্ম্য, এর পেছনের পৌরাণিক কাহিনী, পূজা পদ্ধতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
হরছট পূজার মাহাত্ম্য: সন্তান ও দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ
হরছট পূজার ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মায়েরা তাদের সন্তানদের মঙ্গলের জন্য এই ব্রত পালন করেন, যাতে তারা দীর্ঘ জীবন, সুস্বাস্থ্য ও জীবনে সাফল্য লাভ করতে পারে। বিশ্বাস করা হয় যে এই দিনে করা পূজা ও ব্রত সন্তানদের সমস্ত কষ্ট ও বাধা থেকে মুক্তি দেয়।
- মাতৃত্বের প্রতীক: এই ব্রত মায়ের তার সন্তানদের প্রতি অসীম ভালোবাসা ও আত্মত্যাগকে প্রকাশ করে। মায়েরা উপোস থেকে বা ফলমূল খেয়ে তাদের সন্তানদের জন্য মঙ্গল কামনা করেন।
- বলরামের জন্মোৎসব: হরছট তিথিতেই ভগবান বলরামের জন্ম হয়েছিল। বলরামকে শক্তি ও কৃষির দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার পূজা করলে শক্তি, বুদ্ধি ও সমৃদ্ধি লাভ হয়।
- কৃষি সংস্কৃতির সাথে সংযোগ: বলরামের প্রধান অস্ত্র হলো লাঙল, যা কৃষি ও পৃথিবীর সাথে সংযোগের প্রতীক। তাই এই উৎসবের সাথে কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের সমৃদ্ধির যোগসূত্র রয়েছে। এই দিনে লাঙল দিয়ে চাষ করা শস্য খাওয়া নিষিদ্ধ।
হরছট পূজার পৌরাণিক কাহিনী
হরছট ব্রতের সাথে বেশ কয়েকটি পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে, যার মধ্যে ভগবান বলরামের জন্মের কাহিনী সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।
ভগবান বলরামের জন্মের কাহিনী
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, দেবকীর সপ্তম গর্ভে ভগবান বলরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কংসের ভয়ে ভগবান বিষ্ণু যোগমায়ার সাহায্যে দেবকীর গর্ভকে রোহিণী দেবীর গর্ভে স্থানান্তর করিয়েছিলেন। রোহিণী, যিনি নন্দ বাবার স্ত্রী ছিলেন, তিনি বলরামের জন্ম দেন। যে তিথিতে বলরামের জন্ম হয়েছিল, সেটি ছিল ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ষষ্ঠী। যেহেতু বলরামের প্রধান অস্ত্র ছিল লাঙল, তাই এই ষষ্ঠী ‘হলষষ্ঠী’ বা ‘হরছট’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই দিনে তার পূজা করলে শক্তি, সাহস ও সন্তান সুখ লাভ হয়।
অন্য একটি প্রচলিত কাহিনী
অন্য একটি কাহিনী অনুসারে, এক গোপাঙ্গনা হরছট ব্রত পালন করছিলেন। প্রসব বেদনা উঠলে তিনি একটি মাঠে গিয়ে সন্তান প্রসব করেন। তিনি তৃষ্ণার্ত ছিলেন এবং লাঙল দিয়ে চাষ করা জমি থেকে জল পান করেন। এতে তার ব্রত ভঙ্গ হয়। ক্রুদ্ধ দেবী ষষ্ঠী তার সন্তানকে হরণ করেন। যখন গোপাঙ্গনা তার ভুল স্বীকার করেন এবং দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তখন দেবী ষষ্ঠী প্রসন্ন হয়ে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেন। সেই থেকে এই ব্রতে লাঙল দিয়ে চাষ করা শস্য এবং গরুর দুধ খাওয়া নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়।
হরছট পূজা পদ্ধতি: কিভাবে ব্রত ও পূজা করবেন
হরছট ব্রত ও পূজা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা উচিত যাতে এর পূর্ণ ফল লাভ করা যায়।
ব্রত পালনের প্রস্তুতি
- স্নান ও সংকল্প: ব্রতের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করুন। এরপর হরছট ব্রতের সংকল্প নিন যে আপনি আপনার সন্তানের মঙ্গলের জন্য এই ব্রত পালন করছেন।
- পূজা স্থানের প্রস্তুতি: বাড়ির উঠোনে বা কোনো পরিষ্কার জায়গায় গোবর দিয়ে মাটি লেপে একটি ছোট পুকুরের মতো গর্ত তৈরি করুন। এর পাশে একটি ছোট ‘মহুয়া’ গাছ লাগান বা তার ডাল স্থাপন করুন। পুকুরে জল ভরে তাতে বেরি, পলাশ গাছের ডাল এবং হরছটের জন্য বিশেষভাবে আনা ‘পসহি’ চাল দিন।
পূজার সামগ্রী
হরছট পূজায় কিছু বিশেষ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়:
- মহুয়া গাছের পাতা ও ডাল
- পসহি চাল (লাঙল ছাড়া চাষ করা জমিতে উৎপন্ন চাল)
- মহিষের দুধ ও দই (গরুর দুধ নিষিদ্ধ)
- লাহি (ভাজা জোয়ার, বাজরা বা ভুট্টা)
- ছোলা, যব, গঙ্গাজল
- ফল, ফুল, ধূপ, দীপ, আগরবাতি
- লাঙলের আকৃতি (মাটি বা গোবর দিয়ে তৈরি)
পূজা পদ্ধতি
পূজা স্থানে বলরাম ও রেবতী দেবীর মূর্তি বা ছবি স্থাপন করুন। প্রথমে গণেশের পূজা করুন। এরপর বলরাম ও রেবতী দেবীর विधिवत পূজা করুন। তাদের চন্দন, সিঁদুর, অক্ষত, ফুল, ধূপ, দীপ অর্পণ করুন। মহুয়া গাছের পাতায় পসহি চাল ও অন্যান্য সামগ্রী রেখে অর্পণ করুন। পুকুরের পাশে বসে হরছটের কাহিনী শুনুন বা বলুন। পূজার সময় হাতে লাহি ও মহিষের দুধ নিয়ে কাহিনী শ্রবণ করা শুভ বলে মনে করা হয়। সন্ধ্যাবেলাও একইভাবে পূজা করা হয়। পূজার সময় ‘ওঁ হলধরায় নমঃ’ মন্ত্র জপ করা শুভ।
হরছট ব্রতের নিয়ম ও সতর্কতা
হরছট ব্রতের কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে যা পালন করা অত্যন্ত জরুরি:
- এই ব্রতে গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ। কেবল মহিষের দুধ ও দই ব্যবহার করা হয়।
- লাঙল দিয়ে চাষ করা জমিতে উৎপন্ন শস্য, ফল বা সবজি খাওয়া যায় না। এর পরিবর্তে পসহি চাল এবং অন্যান্য কন্দমূল খাওয়া হয়।
- ব্রত পালনকারী মহিলারা মহুয়া গাছের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করেন।
- এই ব্রত কেবল পুত্র সন্তান আছে এমন মায়েরা পালন করেন।
- ব্রত পালনের দিন সেলাই বা সূচিকর্মের মতো কাজ করা উচিত নয়।
হরছট ২০২৪: শুভ তিথি ও মুহূর্ত
হরছট উৎসব ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয়। ২০২৪ সালে হরছট পূজা ২৬শে আগস্ট, সোমবার পালিত হবে।
- ষষ্ঠী তিথি শুরু: ২৫শে আগস্ট ২০২৪, সন্ধ্যা ০৭:০৭ মিনিট
- ষষ্ঠী তিথি শেষ: ২৬শে আগস্ট ২০২৪, সন্ধ্যা ০৫:৩৯ মিনিট
উদয়া তিথি অনুসারে, হরছট ব্রত ২৬শে আগস্ট ২০২৪ তারিখে পালিত হবে। পূজার শুভ মুহূর্ত স্থানীয় পঞ্জিকা অনুসারে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তাই আপনার এলাকার পঞ্জিকা দেখে নেওয়া উচিত।
হরছট ব্রতের পারণ
হরছট ব্রতের পারণ (উপবাস ভঙ্গ) সাধারণত সন্ধ্যার পূজা শেষ হওয়ার পর বা পরের দিন সকালে করা হয়। পারণের জন্য পসহি চাল, মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস এবং অন্যান্য ব্রত-উপযোগী খাবার খাওয়া হয়। পারণ করার আগে ভগবান বলরাম ও দেবী ষষ্ঠীর স্মরণ নিন এবং তাদের কাছে সন্তানদের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করুন।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য
হরছট পূজা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও প্রথায় পালিত হয়:
- উত্তর প্রদেশ ও বিহার: এখানে এটি মূলত ললহি छठ বা হলষষ্ঠী নামে পরিচিত।
- মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়: এই রাজ্যগুলিতে হরছট বেশ জনপ্রিয় এবং এটি অত্যন্ত উৎসাহের সাথে পালিত হয়।
- ঝাড়খণ্ড: এখানেও এই উৎসব পুত্রদের দীর্ঘায়ুর জন্য পালিত হয়।
প্রতিটি অঞ্চলে পূজা পদ্ধতি ও সামগ্রীতে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ সন্তানদের মঙ্গল কামনা একই থাকে।
উপসংহার
হরছট পূজা এক পবিত্র উৎসব যা মাতৃত্বের ত্যাগ, ভালোবাসা ও অটুট বিশ্বাসের প্রতীক। এটি ভগবান বলরামের জন্মদিন উদযাপনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এই ব্রত কেবল সন্তানদের দীর্ঘায়ু ও সমৃদ্ধিই প্রদান করে না, বরং পরিবারে সুখ ও ইতিবাচক শক্তির সঞ্চারও করে। विधि-विधान মেনে পালিত এই ব্রত প্রত্যেক মায়ের মনে শান্তি ও সন্তুষ্টি এনে দেয়, এই জেনে যে তারা তাদের সন্তানদের মঙ্গলের জন্য এক পবিত্র কাজ করেছেন।

