সারফেস, ডীপ এবং ডার্ক ওয়েব: ইন্টারনেটের স্তরগুলি
ইন্টারনেটের জগৎকে প্রায়শই একটি বরফখণ্ডের (iceberg) সাথে তুলনা করা হয়। এর একটি ছোট অংশ আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি, যা ‘সারফেস ওয়েব’ নামে পরিচিত। কিন্তু এর বিশাল অংশই আমাদের নাগালের বাইরে, যা ‘ডীপ ওয়েব’ এবং এর একটি ক্ষুদ্র অংশ ‘ডার্ক ওয়েব’ নামে পরিচিত। এই তিনটি স্তর একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এদের কার্যকারিতাও ভিন্ন। এই নিবন্ধে আমরা ইন্টারনেটের এই তিনটি স্তর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, এদের মধ্যেকার পার্থক্য বুঝব এবং কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করব।
সারফেস ওয়েব: প্রতিদিনের ইন্টারনেট

সারফেস ওয়েব হল ইন্টারনেটের সেই অংশ যা আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি এবং যা সার্চ ইঞ্জিন যেমন গুগল, বিং ইত্যাদির মাধ্যমে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে খবরের ওয়েবসাইট, ব্লগ, উইকিপিডিয়া, ই-কমার্স সাইট, সোশ্যাল মিডিয়ার পাবলিক পোস্ট এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের পাবলিক ভিডিও। আপনি যখন কোনো সার্চ ইঞ্জিনে কিছু খোঁজেন, তখন যে ফলাফলগুলি আসে, সেগুলি সবই সারফেস ওয়েবের অংশ।
সারফেস ওয়েবকে ‘ক্লিয়ার ওয়েব’ বা ‘ওপেন ওয়েব’ও বলা হয়। এর পেজগুলি পাবলিকলি অ্যাক্সেসযোগ্য এবং সার্চ ইঞ্জিন ক্রলারদের দ্বারা ইন্ডেক্স করা হয়। যদিও এটিকে ইন্টারনেটের ‘ছোট’ অংশ বলা হয়, কারণ ওয়েবের বেশিরভাগ ডেটা এর বাইরে থাকে, তবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, খবরের আপডেট, কেনাকাটা, ম্যাপ দেখা – সবকিছুই সারফেস ওয়েবের মাধ্যমে সম্ভব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক ফিশিং এবং ম্যালওয়্যার আক্রমণও সারফেস ওয়েবের মাধ্যমেই ঘটে। অনেকেই মনে করেন, যা গুগলে পাওয়া যায় না, তা ডার্ক ওয়েবে আছে। এটি একটি ভুল ধারণা। যা গুগলে পাওয়া যায় না, তার বেশিরভাগই আসলে ডীপ ওয়েবের অংশ, যেমন আপনার ব্যক্তিগত ইমেল ইনবক্স।
ডীপ ওয়েব: সার্চের বাইরে, কিন্তু ব্যক্তিগত
ডীপ ওয়েব হল ইন্টারনেটের সেই বিশাল অংশ যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা ইন্ডেক্স করা হয় না। এর মধ্যে রয়েছে আপনার ইমেল ইনবক্স, অনলাইন ব্যাঙ্কিং পোর্টাল, ক্লাউড স্টোরেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ডেটাবেস, পে-ওয়ালের (paywall) পেছনের আর্টিকেল, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ পোর্টাল এবং লগইন-ভিত্তিক যেকোনো পরিষেবা। এই ডেটাগুলি ব্যক্তিগত বা সুরক্ষিত থাকে এবং অ্যাক্সেস করার জন্য সাধারণত ব্যবহারকারীর নাম ও পাসওয়ার্ডের প্রয়োজন হয়।
২০০১ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী মাইকেল কে. বার্গম্যান ‘ডীপ ওয়েব’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, সার্চ ইঞ্জিনগুলি সমস্ত ডেটা অ্যাক্সেস করতে পারে না। এই ডেটাগুলি ‘আনইনডেক্সড’ (unindexed) থাকে। পুরনো গবেষণা অনুযায়ী, ডীপ ওয়েব সারফেস ওয়েবের চেয়ে কয়েকশ গুণ বড় হতে পারে এবং ইন্টারনেটের প্রায় ৯৬% ডেটা এর অন্তর্ভুক্ত। তবে এই সংখ্যাগুলি পরিমাপের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।
ডীপ ওয়েবের বেশিরভাগ অংশই সম্পূর্ণ বৈধ এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য। আপনার জিমেইল ইনবক্স সার্চ রেজাল্টে আসে না, কিন্তু এটি কোনো অপরাধের জগৎ নয়। ডীপ ওয়েব এবং ডার্ক ওয়েবকে গুলিয়ে ফেলা একটি সাধারণ ভুল। ইউটিউবে প্রায়শই শোনা যায় যে, ‘৯০% ইন্টারনেট ডার্ক ওয়েব’। এটি আসলে ডীপ ওয়েবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ডার্ক ওয়েবের ক্ষেত্রে নয়।
ডার্ক ওয়েব: একটি ছোট, লুকানো জগৎ
ডার্ক ওয়েব হল ডীপ ওয়েবের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা ইচ্ছাকৃতভাবে লুকানো থাকে এবং সাধারণ ব্রাউজার বা সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা অ্যাক্সেস করা যায় না। এটি অ্যাক্সেস করার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার, যেমন টর (Tor – The Onion Router) প্রয়োজন হয়। টর নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস গোপন রাখতে ডেটা ট্র্যাফিককে একাধিক সার্ভারের মাধ্যমে এনক্রিপ্ট করে পাঠায়, যা ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন রাখতে সাহায্য করে।
ডার্ক ওয়েবের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট এবং যারা নজরদারির অধীনে থাকা দেশগুলিতে বাস করেন, তাদের জন্য একটি গোপনীয়তার টুল সরবরাহ করা। তবে, এর অপব্যবহারও হয়। এখানে অবৈধ বাজার, ডেটা লিক সাইট এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
ডার্ক ওয়েবকে প্রায়শই ভুলভাবে ইন্টারনেটের একটি বিশাল এবং ভয়ংকর অংশ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত রিপোর্ট অনুযায়ী, ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলির সংখ্যা সারফেস ওয়েবের তুলনায় অনেক কম। এটি ইন্টারনেটের ‘নীচের পুরো মহাসাগর’ নয়, বরং একটি ছোট, বিশেষায়িত অংশ। এখানেও অনেক স্ক্যাম, ফিশিং এবং ত্রুটিপূর্ণ সাইট রয়েছে।
চলচ্চিত্রের ডায়াগ্রাম বনাম বাস্তব প্রযুক্তি
চলচ্চিত্র এবং কিছু ইউটিউব ভিডিওতে প্রায়শই একটি আট-স্তর বিশিষ্ট ইন্টারনেটের ধারণা দেখানো হয়, যেখানে ডার্ক ওয়েবকে একটি ভয়ংকর এবং রহস্যময় জগৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তব প্রযুক্তি অনেক সরল। ইন্টারনেটের মূল স্তরগুলি হল: সারফেস ওয়েব (ইন্ডেক্সড, পাবলিক), ডীপ ওয়েব (আনইনডেক্সড, সাধারণত লগইন-ভিত্তিক) এবং ডার্ক ওয়েব (আনইনডেক্সড, ইচ্ছাকৃতভাবে লুকানো নেটওয়ার্ক)।
ডার্ক ওয়েবের ধীর গতি এবং এনক্রিপশন পদ্ধতির কারণে এখানে লাইভ স্ট্রিমিং বা উচ্চ-মানের ভিডিও দেখা প্রায় অসম্ভব। ‘রেড রুম’ (Red Room) এর মতো ধারণাগুলি, যেখানে লাইভ অপরাধ দেখানো হয় বলে দাবি করা হয়, সেগুলি প্রায়শই স্ক্যাম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের সাইটগুলি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে টাকা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায় করে এবং পরে কিছুই দেখায় না।
একইভাবে, ডার্ক ওয়েবের অনেক সাইটই অস্থায়ী হয়, প্রায়শই বন্ধ হয়ে যায় বা তাদের ক্লোন তৈরি হয়। ‘হাইডেন উইকি’ (Hidden Wiki) এর মতো সাইটগুলির অনেক ক্লোন ফিশিং এবং ম্যালওয়্যার ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
‘বরফখণ্ডের’ পরিসংখ্যান: কোথায় ভুল হচ্ছে?
প্রায়শই বলা হয় যে, ইন্টারনেটের মাত্র ৪% সারফেস ওয়েব এবং ৯৬% ডীপ ওয়েব। এই ৯৬% পরিসংখ্যানটি ডীপ ওয়েবের জন্য প্রযোজ্য, ডার্ক ওয়েবের জন্য নয়। ডীপ ওয়েব বলতে বোঝায় সমস্ত আনইনডেক্সড ডেটা, যার মধ্যে আপনার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট এবং ইমেলও অন্তর্ভুক্ত। ডার্ক ওয়েব হল ডীপ ওয়েবের একটি ছোট, ইচ্ছাকৃতভাবে লুকানো অংশ।
কোনো ডেটা সার্চ ইঞ্জিনে ইন্ডেক্স করা না থাকলেই তা অবৈধ বা বিপজ্জনক হয়ে যায় না। একইভাবে, কোনো ডেটা লুকানো নেটওয়ার্কে থাকলেই তা একটি বিশাল অপরাধের জগৎ তৈরি করে না। পরিসংখ্যানগুলি প্রায়শই পরিমাপের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। তাই, কোনো নির্দিষ্ট শতাংশের উপর ভিত্তি করে ডার্ক ওয়েবকে বিশাল বা ভয়ংকর বলে মনে করা উচিত নয়।
আইনি নথিভুক্ত মামলা: সিল্ক রোড
চলচ্চিত্রের কাল্পনিক দৃশ্যের বিপরীতে, কিছু ডার্ক ওয়েব-ভিত্তিক কার্যকলাপ আইনি নথিতে নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হল ‘সিল্ক রোড’ (Silk Road)। এটি টর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত একটি লুকানো মার্কেটপ্লেস ছিল, যেখানে অবৈধ পণ্য কেনাবেচা হত। ২০১১ সালে এটি চালু হয় এবং ২০১৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি এটি বন্ধ করে দেয়। এর মূল অপারেটর, রস আলব্রিচটকে (Ross Ulbricht) গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০১৫ সালে তাকে সাজা দেওয়া হয়।
এই মামলা থেকে বোঝা যায় যে, ডার্ক ওয়েব সম্পূর্ণভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। অপারেটরদের ভুল, সার্ভারের ত্রুটি বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব। এটি প্রমাণ করে যে, ‘কেউ ধরা পড়ে না’ এই ধারণাটি ভুল।
ভারতের মতো দেশে, বেশিরভাগ অনলাইন প্রতারণা সারফেস ওয়েবেই ঘটে। যেমন – হোয়াটসঅ্যাপ লটারি, ভুয়া ট্রেডিং অ্যাপ বা ওটিপি (OTP) সংক্রান্ত প্রতারণা। ‘ডার্ক ওয়েবে কিডনি বিক্রি হচ্ছে’ – এই ধরনের শহুরে কিংবদন্তিগুলি মানুষের ভয়কে কাজে লাগায়। তাই, ইন্টারনেটের স্তরগুলি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লিঙ্কের সন্ধানে অযথা ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
ডীপ ওয়েব এবং ডার্ক ওয়েব কি একই জিনিস?
না। ডীপ ওয়েব হল ইন্টারনেটের সেই সমস্ত অংশ যা সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা ইন্ডেক্স করা হয় না, যেমন আপনার ইমেল বা ব্যাঙ্কিং পোর্টাল। ডার্ক ওয়েব হল ডীপ ওয়েবের একটি ক্ষুদ্র অংশ যা ইচ্ছাকৃতভাবে লুকানো নেটওয়ার্কে (যেমন টর) চলে এবং বিশেষ সফটওয়্যার ছাড়া অ্যাক্সেস করা যায় না।
সাধারণ ইন্টারনেট কি মাত্র ৪-১০%?
পুরনো অনুমান অনুযায়ী, সারফেস ওয়েব ইন্টারনেটের একটি ছোট অংশ। তবে, ৯৬% বা তার বেশি যে পরিসংখ্যানটি বলা হয়, তা ডীপ ওয়েবের জন্য প্রযোজ্য, ডার্ক ওয়েবের জন্য নয়। এই পরিসংখ্যানগুলি পরিমাপের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে এবং সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়।
‘রেড রুম’ কি সত্যি?
জনপ্রিয় বিশ্বাস সত্ত্বেও, লাইভ ‘রেড রুম’ স্ট্রিমিং-এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, এই ধরনের দাবি করা ওয়েবসাইটগুলি সাধারণত ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য স্ক্যাম বা প্রতারণা করে থাকে। এই নিবন্ধটি এই ধরনের সাইটে প্রবেশের কোনো উপায় প্রদান করে না।
ডার্ক ওয়েবে কি সবকিছুই অবৈধ?
না। ডার্ক ওয়েব গোপনীয়তা এবং সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্টদের মতো বৈধ উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে, এখানে অবৈধ কার্যকলাপের বাজারও বিদ্যমান। নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব নিজে অপরাধ নয়, তবে অবৈধ পণ্য বা পরিষেবা কেনা-বেচা আইনত দণ্ডনীয়।
চলচ্চিত্রের আট-স্তর বিশিষ্ট ইন্টারনেট কি বাস্তব?
না, এটি একটি কাল্পনিক ধারণা। প্রযুক্তিগতভাবে, ইন্টারনেটের মূল স্তরগুলি হল সারফেস, ডীপ এবং ডার্ক ওয়েব। আট-স্তর বিশিষ্ট ইন্টারনেটের ধারণাটি মূলত বিনোদনমূলক এবং বাস্তব প্রযুক্তির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
উপসংহার
ইন্টারনেটের তিনটি স্তর – সারফেস, ডীপ এবং ডার্ক ওয়েব – একে অপরের থেকে আলাদা এবং এদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সারফেস ওয়েব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, ডীপ ওয়েব আমাদের ব্যক্তিগত ডেটা ধারণ করে এবং ডার্ক ওয়েব একটি বিশেষায়িত, লুকানো নেটওয়ার্ক। এই স্তরগুলি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা জরুরি, যাতে আমরা ভুল তথ্য এবং স্ক্যাম থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। মনে রাখবেন, ইন্টারনেটের গভীরে যাওয়ার চেয়ে এর সঠিক ব্যবহার এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।