বাচ্চাদের স্কুলভীতি কেন হয়?
ছোট বাচ্চারা সাধারণত নতুন পরিবেশ বা অচেনা জায়গায় যেতে ভয় পায়। তাদের মন খুব চঞ্চল হয় এবং এক জায়গায় বেশিক্ষণ মন বসানো তাদের জন্য কঠিন। স্কুলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে অনেকক্ষণ পড়াশোনা করতে হয়, যা তাদের কাছে একঘেয়ে লাগতে পারে। তাদের মন খেলতে, দৌড়াতে এবং লাফাতে চায়। স্কুলে পড়াশোনা ও খেলার জন্য নির্দিষ্ট সময় ভাগ করা থাকে, তাই শুরুতে বাচ্চারা এই রুটিনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না এবং স্কুলে যেতে ভয় পায়।
এই সময় বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো বাচ্চাকে বোঝানো যে স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য কতটা জরুরি এবং এর সুবিধাগুলো কী কী। যদিও ছোট বাচ্চারা সহজে এই বড় কথাগুলো বুঝতে পারে না, তবে তাদের বুঝিয়ে বললে বা আদর করে বোঝালে তারাও ধীরে ধীরে সবটা বুঝে নেয়।
স্কুলে যেতে ভয় পেলে বাচ্চারা কী করে?

যখনই আমরা বাচ্চাদের স্কুলের কথা বলি, তারা কাঁদতে শুরু করে। তাদের স্কুলে যেতে একদমই ভালো লাগে না। যখন তাদের স্কুলে পাঠানোর সময় হয়, তখন তারা যেতে চায় না এবং বায়না ধরে। তাদের আচরণে মনে হয় যেন তারা স্কুলকে ভয় পাচ্ছে এবং স্কুলের নাম শুনলেই ঘাবড়ে যায় বা কেঁদে ফেলে। কিছু বাচ্চা তো নানা রকম অজুহাতও দেয়, যেমন – শরীর ব্যথা করছে, পেটে ব্যথা, মন লাগছে না, মাথা ধরেছে, বমি পাচ্ছে ইত্যাদি।
স্কুলে যেতে ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। বাড়ির বাইরে বা বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকলে বাচ্চারা নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। স্কুলে তাদের নিয়মকানুন শেখানো হয়, তাই তাদের মনে ভয় জন্মাতে পারে। যদি সেই সময় কোনো শিক্ষক তাদের বকা দেন বা অন্য কোনো বাচ্চাকে বকা দেন বা মারেন, তাহলে বাচ্চারা আরও বেশি ভয় পেতে শুরু করে। সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর বয়সের বাচ্চাদের মধ্যে এই স্কুলভীতি বেশি দেখা যায়। এই বয়সে তাদের স্বভাবের পরিবর্তনও আসে, তারা ছোটখাটো বিষয়ে রেগে যায়, চিৎকার করে এবং কোনো কথা শুনতে চায় না।
বাচ্চারা স্কুল যেতে কেন ভয় পায়?
- নতুন জায়গা বা পরিবেশের ভয়।
- অচেনা বা নতুন মানুষের ভয়।
- বাড়ি ও বাবা-মায়ের থেকে দূরে যাওয়ার ভয়।
- হোমওয়ার্ক না করলে শাস্তি পাওয়ার ভয়।
- শিক্ষকদের বকা বা বারণের ভয়।
- অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা করার ভয়।
- স্কুলে নতুন বন্ধু না হওয়ার ভয়।
- পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়।
- স্কুলে অন্য বাচ্চাদের খারাপ আচরণের ভয়।
স্কুলভীতি কাটানোর উপায়

যদি আপনার সন্তানও স্কুল যেতে ভয় পায়, স্কুলে যেতে চায় না বা বারবার অজুহাত দেয়, তাহলে তার আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। দেখুন ঠিক কী কারণে সে স্কুলে যেতে চাইছে না। স্কুলে পরিবেশ কি তার জন্য খারাপ? তার কি কোনো খারাপ বন্ধুর সাথে মিশছে? অনেক সময় কিছু দুষ্টু বাচ্চা ভালো বাচ্চাদের জ্বালাতন করে, যার ফলে বাচ্চারা স্কুলে যেতে ভয় পায়। তাই বাবা-মায়ের উচিত বাচ্চার স্কুল জীবনের উপর নজর রাখা। স্কুলে গিয়ে সে কী করে, কতক্ষণ পড়াশোনা করে, বন্ধুদের সাথে কতক্ষণ সময় কাটায়, শিক্ষকদের সাথে কেমন ব্যবহার করে – এই সবকিছুর উপর খেয়াল রাখা উচিত। বাচ্চার রুটিন সম্পর্কে বাবা-মায়ের একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার।
শিশুদের স্কুলে পাঠানোর কিছু সহজ টিপস
- প্রথম দিনের প্রস্তুতি: যদি আপনি আপনার সন্তানকে প্রথমবার স্কুলে পাঠান, তবে তার স্কুলের রুটিন ভালোভাবে জেনে নিন। সে সারাদিন স্কুলে কীভাবে সময় কাটাবে, তা জেনে নিলে বাচ্চার ভয় কিছুটা কমতে পারে।
- পছন্দের জিনিস সঙ্গে দিন: যদি বাচ্চা ছোট হয়, তবে তাকে তার পছন্দের কোনো খেলনা বা জিনিস সঙ্গে দিয়ে স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করুন। তাকে কথা দিন যে স্কুলে ভালো ব্যবহার করলে বা মন দিয়ে পড়াশোনা করলে তাকে আরও এমন জিনিস কিনে দেওয়া হবে।
- টিফিন বক্সে পছন্দের খাবার: বাচ্চারা যে টিফিন বক্স নিয়ে যায়, তাতে তাদের পছন্দের খাবার দিন। পছন্দের খাবার পেলে বাচ্চারা স্কুলে যেতে আগ্রহী হবে।
- নিয়মিত খোঁজখবর নিন: বাবা-মায়ের উচিত বাচ্চার কাছ থেকে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া যে স্কুলে তার কী ভালো লাগছে বা কী ভালো লাগছে না। যদি কোনো কিছু তার ভালো না লাগে, তবে সে বিষয়ে বাচ্চার শিক্ষকের সাথে কথা বলুন।
- ভয়ের কারণ জানুন: যদি বাচ্চা স্কুলকে খুব বেশি ভয় পায়, তবে তার কারণ খুঁজে বের করুন। স্কুলে গিয়ে শিক্ষকের সাথে কথা বলুন এবং জানুন কেন আপনার সন্তান স্কুল থেকে এত ভয় পাচ্ছে।
- প্রশংসা করুন ও উৎসাহ দিন: বাচ্চার ছোট ছোট কাজের প্রশংসা করুন। সে যদি সময়মতো হোমওয়ার্ক করে, তবে তার প্রশংসা করুন, তাকে উপহার দিন। বাচ্চাকে সবসময় স্কুলের গুরুত্ব বোঝান এবং বলুন স্কুলে যাওয়ার সুবিধাগুলো কী কী।
- ছোটখাটো লোভ দেখান: বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য আপনি ছোটখাটো লোভ দেখাতে পারেন। যেমন – ছুটির দিনে সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া, তার পছন্দের খাবার খাওয়ানো বা পার্কে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া।
- চাপ দেবেন না: বাচ্চার উপর পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। বাড়িতে পড়াশোনার জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন এবং সেই অনুযায়ী তাকে পড়তে দিন। তাকে মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরতে যাওয়ার এবং অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলার সুযোগ দিন।
- মারধর করবেন না: যদি বাচ্চা স্কুল যেতে অস্বীকার করে, তবে তাকে মারধর করার চেষ্টা করবেন না। কেন সে স্কুলে যেতে চাইছে না, সেই কারণ বোঝার চেষ্টা করুন।
- সঙ্গে থাকুন: প্রথমদিকে বাচ্চার সাথে স্কুলে যান এবং কিছুক্ষণ তার পাশে থাকুন। এতে বাচ্চার ভয় কমবে এবং সে স্বস্তি বোধ করবে।
- ভালো বন্ধু তৈরি করুন: আপনার সন্তানকে এমন বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে উৎসাহিত করুন যারা নিয়মিত স্কুলে যায়। এতে সে স্কুলে যেতে আগ্রহী হবে কারণ সে তার পছন্দের বন্ধুদের স্কুলে পাবে।
- আকর্ষণীয় জিনিসপত্র দিন: বাচ্চাকে সুন্দর সুন্দর বই, খাতা, পেন, পেন্সিল বক্স, স্কুল ব্যাগ ইত্যাদি কিনে দিন। এই জিনিসগুলো তার মন জয় করতে পারে এবং সে আগ্রহ নিয়ে স্কুলে যাবে।
যদি এতকিছুর পরেও আপনার সন্তান স্কুল যেতে খুব বেশি ভয় পায়, তবে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। হতে পারে তার কোনো ফোবিয়া আছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। সময় লাগলেও তারা নিজেরা স্কুলে যেতে শুরু করে এবং পড়াশোনায় মন দেয়।
যদি বাচ্চাদের স্কুল পাঠানো নিয়ে আপনার মনে কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আমরা আপনার সবরকম সাহায্য করার চেষ্টা করব।
FAQs

প্রশ্ন: বাচ্চারা কেন স্কুল যেতে ভয় পায়?
উত্তর: বাচ্চারা নতুন পরিবেশ, অচেনা মানুষ, বাড়ির থেকে দূরে থাকা, শাস্তি পাওয়ার ভয়, শিক্ষকদের বকা বা অন্য বাচ্চাদের খারাপ আচরণের কারণে স্কুল যেতে ভয় পেতে পারে।
প্রশ্ন: আমার বাচ্চা স্কুলে যেতে চায় না, কী করব?
উত্তর: বাচ্চার ভয় পাওয়ার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। তার সাথে কথা বলুন, তাকে উৎসাহ দিন, পছন্দের খাবার বা জিনিস দিয়ে স্কুলে যেতে রাজি করান। প্রয়োজনে শিক্ষকের সাথে কথা বলুন।
প্রশ্ন: প্রথমবার স্কুলে পাঠানোর আগে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
উত্তর: বাচ্চার স্কুলের রুটিন জেনে নিন, তার পছন্দের টিফিন ও জিনিস সঙ্গে দিন, এবং তাকে বোঝান যে স্কুল একটি মজার জায়গা।
প্রশ্ন: স্কুলে যেতে ভয় পেলে কি ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
উত্তর: যদি বাচ্চার ভয় খুব বেশি হয় এবং কোনোভাবেই না কমে, তবে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।