Skip to content

শराब ছাড়ানোর বাবাদের কালো রহস্য: এই বড় স্ক্যাম কীভাবে হয় এবং আসল সমাধান কী?

Health Vivek Hardaha

শরাব ছাড়ানোর নামে প্রতারণা করা ভণ্ড বাবাদের ছবি

শराब ছাড়ানোর নামে প্রতারণা: বাবা না লুটেরা?

যখন পরিবারের কেউ মারণ নেশা, অর্থাৎ মদের ছোবলে জর্জরিত হয়ে পড়ে, তখন দিশেহারা পরিবারগুলো প্রায়শই শেষ আশা হিসেবে শরণাপন্ন হন তথাকথিত ‘বাবা’, ‘গুরুজি’ বা ‘সিদ্ধ বৈদ্য’-দের। তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাদের অলৌকিক ক্ষমতা বা বিশেষ পদ্ধতিতে এই নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক বিরাট প্রতারণা ও আর্থিক কেলেঙ্কারি। शराब की लत শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয় – অর্থনৈতিক, মানসিক এবং আবেগিকভাবে। এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েই কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের ‘মুক্তিদাতা’ হিসেবে জাহির করে এবং নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। এই প্রবন্ধে আমরা এই প্রতারণার জাল এবং এর থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে আলোচনা করব।

‘এলআইসি কিস্তি’-র মতো ব্যবসা: বাবাদের ব্যবসায়িক মডেল

এই তথাকথিত বাবাদের ব্যবসায়িক মডেল অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে। অনেকটা জীবন বীমা কর্পোরেশনের (LIC) পলিসির মতো, যেখানে নিয়মিত প্রিমিয়াম দিতে হয়, তেমনই এই বাবাদের কাছেও নিয়মিত ‘পেশী’ বা দেখা করার জন্য যেতে হয়।

  • প্রথম সাক্ষাৎ: প্রথমবার দেখা করতে গেলে বলা হয়, “এটা তো সবে শুরু। অন্তত ১৫-২০ বার আসতে হবে। এই নেশা অনেক দিনের, তাই পুরোপুরি সারতে সময় লাগবে।”
  • প্রতি পেশীর খরচ: প্রতিবার দেখা করার জন্য ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা বা তারও বেশি নেওয়া হয়। কখনও ‘পুজো’র নাম করে, কখনও ‘ওষুধ’ বা ‘বিশেষ আচারের’ অজুহাতে এই টাকা আদায় করা হয়।
  • ওষুধের নামে প্রতারণা: প্রায়শই তারা কিছু পাউডার বা তরল পদার্থ দেয়, যেগুলোকে ‘চমৎকার ওষুধ’ বলে প্রচার করা হয়। এর উপাদান কী, তা কেউ জানে না। অনেক সময় এতে এমন কিছু মেশানো থাকে যা খেলে বমি বা অস্বস্তি হতে পারে। তারা একে ‘শরীর থেকে বিষ বের হওয়া’ বলে ব্যাখ্যা করে।
  • ভয় ও কুসংস্কারের খেলা: ‘গ্রহের দোষ’, ‘খারাপ আত্মার প্রভাব’, ‘কারও নজর লেগেছে’ – এই ধরনের কথা বলে তারা পরিবারকে আরও ভয় দেখায়, যাতে তারা তাদের নির্দেশ মেনে চলে এবং টাকা খরচ করতে থাকে।
  • অবিরাম প্রক্রিয়া: যখন এক মাসের মধ্যে কোনও উন্নতি দেখা যায় না, তখন তারা বলে, “এখনও কাজ শুরু হয়নি, আরও সময় লাগবে।” এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ না পরিবার সম্পূর্ণভাবে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যায় অথবা তারা সত্যটা বুঝতে পারে। এদের ব্যবসা আসলে চিকিৎসার উপর নয়, বরং মানুষের অসহায়তা ও কুসংস্কারের উপর নির্ভরশীল।

কেন মানুষ এই বাবাদের ফাঁদে পা দেয়?

এটা বোঝা জরুরি যে, কেন মানুষ সহজেই এই ধরনের প্রতারকদের জালে জড়িয়ে পড়ে:

  • হতাশা ও অসহায়তা: যখন প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যয়বহুল মনে হয় বা আগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ যে কোনও আশার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
  • সামাজিক লজ্জা: মদের নেশাকে প্রায়শই একটি রোগ না ভেবে ‘চরিত্রহীনতা’ হিসেবে দেখা হয়। এই সামাজিক লজ্জার কারণে অনেকে ডাক্তার বা হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে ভয় পান এবং গোপনে ‘চিকিৎসা’ খোঁজেন।
  • সচেতনতার অভাব: অনেকেই शराबের নেশা ছাড়ানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (যেমন ডি-এডিকশন সেন্টার, থেরাপি, ওষুধ) সম্পর্কে অবগত নন।
  • তাৎক্ষণিক সমাধানের আকাঙ্ক্ষা: প্রত্যেকেই চায় সমস্যাটি যেন সঙ্গে সঙ্গে মিটে যায়। বাবা-ঠাকুররা প্রায়শই ‘চমৎকার নিরাময়’ এবং ‘একবার চেষ্টা করলেই নেশা ছাড়বে’ – এমন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন।
  • আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস: ভারতে আধ্যাত্মিক গুরুদের উপর গভীর আস্থা রয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের অলৌকিক ক্ষমতা আছে এবং তারা সব সমস্যা দূর করতে পারেন।

আসল সমাধান কী? বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর পদ্ধতি

শराबের নেশা একটি গুরুতর রোগ, যার জন্য বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখানে কিছু কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধানের উল্লেখ করা হলো:

  • ডি-এডিকশন সেন্টার (নশা মুক্তি কেন্দ্র): এই বিশেষ কেন্দ্রগুলিতে প্রশিক্ষিত ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী এবং কাউন্সেলরদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করা হয়। এখানে নিরাপদে শরীর থেকে নেশার প্রভাব দূর করা হয় এবং মানসিক নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করা হয়।
  • মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ (কাউন্সেলিং ও থেরাপি): নেশার পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলি বোঝা এবং সেগুলি মোকাবিলা করার জন্য ব্যক্তিগত ও দলগত থেরাপি খুব কার্যকর। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) এবং মোটিভেশনাল এনহ্যান্সমেন্ট থেরাপি (MET) এক্ষেত্রে সহায়ক।
  • ওষুধ: কিছু ওষুধ মদের প্রতি আকাঙ্ক্ষা কমাতে এবং নেশা ছাড়ার পরবর্তী শারীরিক কষ্ট (withdrawal symptoms) নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে এই ওষুধগুলি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে সেবন করা উচিত।
  • সহায়তা গোষ্ঠী (সাপোর্ট গ্রুপ): অ্যালকোহলিক্স অ্যানোনিমাস (AA)-এর মতো গোষ্ঠীগুলি তাদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে যারা নেশা থেকে সেরে ওঠার চেষ্টা করছেন। এখানে সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন এবং একে অপরকে সমর্থন করেন।
  • পারিবারিক সহযোগিতা: পরিবারের সমর্থন ও বোঝাপড়া নেশা থেকে মুক্তির প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবারের সদস্যদেরও শেখানো উচিত যে তারা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন।
  • মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist): যদি নেশার সঙ্গে ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি বা অন্য কোনও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে, তবে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য।

পরিবারকে এই প্রতারণা থেকে বাঁচাবেন কীভাবে?

সচেতনতাই হল প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। নিম্নলিখিত বিষয়গুলি মনে রাখুন:

  • তথ্য সংগ্রহ করুন: शराब की लत এবং এর বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করুন।
  • সন্দেহ করুন: যদি কেউ কোনও ‘চমৎকার’ বা ‘গোপন’ চিকিৎসার দাবি করে যা কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই দ্রুত নেশা ছাড়িয়ে দেবে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ করুন।
  • প্রমাণিত পেশাদারের সন্ধান করুন: সর্বদা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডাক্তার, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা স্বীকৃত নশা মুক্তি কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তাদের শংসাপত্র এবং অভিজ্ঞতা যাচাই করুন।
  • আর্থিক স্বচ্ছতা: যারা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বা যাদের ফি সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই, তাদের থেকে সাবধান থাকুন। প্রকৃত চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিতে খরচের বিষয়টি স্বচ্ছ থাকে।
  • আইনি পদক্ষেপ: যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হন, তবে স্থানীয় পুলিশ বা ভোক্তা সুরক্ষা বিভাগে অভিযোগ দায়ের করুন।

শराबের নেশা থেকে মুক্তি পাওয়া একটি দীর্ঘ এবং কঠিন যাত্রা হতে পারে, কিন্তু এটি অসম্ভব নয়। সঠিক তথ্য, বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা এবং পারিবারিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে কেউ এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে। মিথ্যা বাবাদের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের সময়, অর্থ এবং আশা নষ্ট করবেন না। আসল সাহায্যের সন্ধান করুন, যা আপনার হাতের কাছেই রয়েছে।

FAQs

  1. শराब ছাড়ানোর বাবাদের দেওয়া ওষুধ কি সত্যিই কাজ করে?
    বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই বাবাদের দেওয়া ওষুধে কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে না। এগুলি সাধারণত সাধারণ উপাদান দিয়ে তৈরি হয় অথবা এতে এমন কিছু মেশানো থাকতে পারে যা ক্ষতিকারক। আসল চিকিৎসা একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।
  2. নশা মুক্তি কেন্দ্রগুলিতে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়?
    নশা মুক্তি কেন্দ্রগুলিতে ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী এবং কাউন্সেলরদের তত্ত্বাবধানে ডিটক্সিফিকেশন, কাউন্সেলিং, থেরাপি এবং প্রয়োজনে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
  3. আমার পরিচিত কেউ মদের নেশায় আসক্ত, আমি কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি?
    ধৈর্য ধরুন এবং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। তাকে একজন ডাক্তার বা নশা মুক্তি কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করুন। পরিবারের সমর্থন তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
  4. শराब ছাড়ানোর জন্য কোনও ঘরোয়া টোটকা আছে কি?
    যদিও কিছু ঘরোয়া উপায় সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তবে शराब की लत একটি গুরুতর রোগ এবং এর জন্য পেশাদার চিকিৎসা প্রয়োজন। কোনও ঘরোয়া টোটকাকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
  5. বাবাদের দেওয়া ‘চমৎকার’ নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি কি বিশ্বাসযোগ্য?
    না, এই ধরনের প্রতিশ্রুতি সাধারণত বিশ্বাসযোগ্য নয়। নেশা ছাড়ানো একটি সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং এর জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

Share Your Opinion

Comments are closed on this post.

More on Site