সম্রাট অশোকের নয় অজ্ঞাত পুরুষ: ইতিহাস না কি কল্পকাহিনী?

সম্রাট অশোকের শিলালিপি এবং নয় অজ্ঞাত পুরুষের কিংবদন্তি

নয় অজ্ঞাত পুরুষ: কিংবদন্তি বনাম বাস্তবতা

সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর থেকে নয়জন রহস্যময় ব্যক্তির একটি গোপন গোষ্ঠী বিশ্বজুড়ে জ্ঞান ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন এক কাহিনি প্রচলিত আছে। এই গোষ্ঠীর হাতে নাকি রয়েছে প্রচার, মৃত্যু-স্পর্শ, কিমিয়া, মহাকর্ষ এবং এমনকি বিমান চালনার মতো গোপন বিদ্যা। এই গল্প এতটাই আকর্ষণীয় যে অনেক সময় একে ‘ভারতের ইলুমিনাতি’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কাহিনির ভিত্তি কি সম্রাট অশোকের শিলালিপি, নাকি এটি একটি ইংরেজি অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস থেকে উদ্ভূত?

विज्ञापन

সত্যিটা হলো, সম্রাট অশোকের শিলালিপিগুলোতে তাঁর রাজত্বকালের ঘটনা, তাঁর অনুতাপ এবং তাঁর ধর্মীয় নীতির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ‘নয় অজ্ঞাত পুরুষ’, তাদের নয়টি গোপন বই বা দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকা কোনো গুপ্ত সংগঠনের কথা সেখানে নেই। এই ধারণাটি আসলে আধুনিক কল্পকাহিনীর অংশ, যার জন্ম ১৯২৩ সালের একটি উপন্যাসে এবং যা পরে ১৯৬০ সালের একটি ফরাসি বইয়ের মাধ্যমে ‘সত্য’ হিসেবে প্রচারিত হয়।

জনপ্রিয় কাহিনি যেভাবে প্রচারিত হয়

অশোকের শিলালিপির ছবি

লোকমুখে প্রচলিত কাহিনিটি বেশ রোমাঞ্চকর। কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে সম্রাট অশোক নাকি জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি আশঙ্কা করেন যে কিছু জ্ঞান যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে তা আরও ধ্বংস ডেকে আনবে। তাই তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের নয়জন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয় এবং প্রত্যেককে একটি করে গোপন বই দেওয়া হয়। এই গোষ্ঠীর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য মারা গেলে তার স্থান অন্য কেউ পূরণ করে নেয়। কথিত আছে, এই গোষ্ঠী আজও পৃথিবীর কোথাও লুকিয়ে থেকে নীরবে বিশ্বের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে।

এই কাহিনির উপর পরে আরও নানা স্তর যুক্ত হয়েছে। কেউ বলেন, পোপ সিলভেস্টার দ্বিতীয় নাকি ভারতে এসে এদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আবার কেউ বলেন, খরার সময় মন্দিরে সোনা ‘গুপ্ত উৎস’ থেকে আসত। জুডো, বিমান, বা মহামারীর ওষুধ—এসব নাকি এই গোষ্ঠী থেকেই ‘ফাঁস’ হয়েছে। কিছু লেখায় আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু বা ড. বিক্রম সারাভাইকেও এই গোষ্ঠীর সদস্য বলে দাবি করা হয়। তবে এই ধরনের দাবিগুলো ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং ইন্টারনেটের একটি সাধারণ প্রবণতা—একটি আকর্ষণীয় কাঠামোর উপর যেকোনো বিখ্যাত ব্যক্তির নাম জুড়ে দেওয়া।

এই কাহিনিটি মানুষের মনে দাগ কাটে কারণ এতে তিনটি বিষয় একসঙ্গে মিশে আছে: একজন বাস্তব সম্রাট, গোপন জ্ঞান এবং এই ধারণা যে ভারত এমন কিছু জানত যা পশ্চিমা বিশ্ব পরে ‘আবিষ্কার’ করেছে। এই আবেগটি বোধগম্য হলেও, এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

विज्ञापन

শিলালিপিতে অশোক: যা আমরা জানি

সম্রাট অশোকের শাসনকাল আনুমানিক ২৬৮–২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে মনে করা হয়। তাঁর পরিচয় পরবর্তীকালের বৌদ্ধ কাহিনিগুলোর উপর নির্ভর করে না, বরং তাঁর সময়ের শিলালিপিগুলোই তাঁর অস্তিত্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। তাঁর আদেশগুলো শিলা, স্তম্ভ এবং গুহার গায়ে খোদাই করা আছে—ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, এমনকি কিছু স্থানে গ্রিক ও আরামাইক লিপিতেও।

১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সেপ ‘দেবানম্পিয় পিয়াসি’ (Devanampiya Piyadassi) লেখাগুলো পাঠোদ্ধার করেন। ১৯১৫ সালে কর্ণাটকের মাস্কি নামক স্থানের একটি लघु শিলালিপি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে: ‘দেবানম্পিয় অশোক’। এর মানে হলো, রাজার নাম পাথরে খোদাই করা আছে, কোনো গুজবে নয়।

কলিঙ্গ যুদ্ধের পর তাঁর অনুতাপ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তাঁর ত্রয়োদশ প্রধান শিলালিপিতে পাওয়া যায়। সেখানে যুদ্ধের পর নিহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং রাজা ঘোষণা করেছেন যে ধর্ম-বিজয়ই প্রকৃত বিজয়। পশু বলি বন্ধ করা, সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি সহিষ্ণুতা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, কূপ খনন, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন এবং দূত প্রেরণ—এই নীতিগুলো শিলালিপির ভাষাতেই বর্ণিত আছে।

তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি এবং ধর্ম প্রচারের কাহিনি বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে যুক্ত হয়েছে। এই পুরো কাঠামোটি জ্ঞান গোপন করার জন্য নয়, বরং তা প্রচার করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এখানেই ‘নয় অজ্ঞাত পুরুষ’-এর কাহিনিটি হোঁচট খায়। বিদ্যমান শিলালিপিগুলোতে নয়জন রক্ষক, নয়টি গোপন গ্রন্থ বা ‘বিপজ্জনক বিজ্ঞানকে জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখার’ কোনো নির্দেশ পাওয়া যায় না। অশোকের বার্তা ছিল ঠিক বিপরীত: তাঁর নীতিগুলো জনসাধারণের পড়ার জন্য শিলালিপিতে খোদাই করা হতো। একটি গুপ্ত সংগঠনের পুরো ধারণাটি সেই উৎস থেকেই অনুপস্থিত, যেখান থেকে আমরা অশোককে জানতে পারি।

১৯২৩: ট্যালবট মুন্ডির উপন্যাস

আধুনিক বিশ্বে এই কাহিনিটির পরিচিতি মূলত একটি বইয়ের মাধ্যমে। ট্যালবট মুন্ডি (প্রকৃত নাম উইলিয়াম ল্যাঙ্কাস্টার গ্রিবেন, ১৮৭৯–১৯৪০) ছিলেন একজন ব্রিটিশ লেখক। তিনি ভারতে বসবাস করেছিলেন এবং পরবর্তীতে থিওসফির (Theosophy) দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। মার্চ-এপ্রিল ১৯২৩ সালে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ (Adventure) ম্যাগাজিনে তাঁর উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরে ১৯২৩-২৪ সালে ‘দ্য নাইন আননোন’ (The Nine Unknown) নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

विज्ञापन

এই উপন্যাসটি জিমগ্রিম/র‍্যামসডেন (Jimgrim/Ramsden) অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের অংশ ছিল, যেখানে গুপ্তধন, ভারতের রহস্যময় পথ, গোপন সম্প্রদায় এবং প্রাচীন জ্ঞানকে ‘বৈজ্ঞানিক’ ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। উপন্যাসে নয়জন অজ্ঞাত ব্যক্তি ভালো রক্ষক হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। তাদের বিপরীতে কালিকা/শাক্ত ধারার কিছু লোক রয়েছে যারা নিজেদের আসল নয় বলে দাবি করে এবং তাদের রহস্য চুরি করতে চায়। ফাদার সিপ্রিয়ান বইগুলো ধ্বংস করতে চান। গঙ্গার অলৌকিক শুদ্ধিকরণের মতো দৃশ্যও এতে রয়েছে।

এর এক বছর পর, মুন্ডির আরেকটি বই ‘কেভস অফ টেরর’ (Caves of Terror, 1924) প্রকাশিত হয়, যেখানে এই নয়জন ব্যক্তি ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন—এবার তারা যেন অশুভ শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। একজন লেখক মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটি গোষ্ঠীর ভালো ও মন্দ উভয় দিক তুলে ধরলে, তা ইতিহাসের প্রমাণ না হয়ে গল্পের উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়। মুন্ডি কোনো ইতিহাসবিদ বা শিলালিপি বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; তিনি রোমাঞ্চকর গল্প লিখতেন যেখানে গুপ্ত সাধু, হারানো বিজ্ঞান এবং ভারতের রহস্য একসঙ্গে মিশে থাকত। থিওসফিতে ‘গুপ্ত গুরু’ এবং প্রাচীন জ্ঞানের রক্ষকদের ধারণা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। তাঁর উপন্যাস সেই কল্পনাকে অশোকের নামের সঙ্গে জুড়ে দেয়। অশোকের অনুতাপ ঐতিহাসিক সত্য হতে পারে, কিন্তু নয়জনের আসনটি উপন্যাসের সৃষ্টি।

১৯৬০: যখন কল্পকাহিনী ‘গুপ্ত ইতিহাস’ হয়ে উঠল

দ্বিতীয় বড় ধাক্কাটি আসে ১৯৬০ সালে লুই পোভেলস (Louis Pauwels) এবং জ্যাক বার্জিয়ের (Jacques Bergier) রচিত ফরাসি বই ‘লে মাতিন দেস ম্যাজিসিয়েনস’ (Le Matin des Magiciens) থেকে, যা ইংরেজিতে ‘দ্য মর্নিং অফ দ্য ম্যাজিশিয়ানস’ (The Morning of the Magicians) নামে পরিচিত। লেখকদের মতে, এই বইটির উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কৌতূহল জাগানো। এতে ইউএফও, কিমিয়া, নাৎসি গুপ্তবিদ্যা সহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানেই ‘নয় অজ্ঞাত পুরুষ’-কে প্রাচীন সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়—অশোক প্রায় ২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটি তৈরি করেছিলেন, লুই জ্যাকোলিও (Louis Jacolliot) তাদের অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন এবং পোপ সিলভেস্টার দ্বিতীয় তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

সমস্যাটি হলো এর উৎসের। জ্যাকোলিও ছিলেন উনিশ শতকের একজন ফরাসি বিচারক ও লেখক, যিনি ভারত ও তাহিতি ভ্রমণ করেছিলেন এবং ভারত নিয়ে অনেক রহস্যময় বই লিখেছিলেন। কিছু পণ্ডিত মনে করেন, তাঁর কিছু লেখা পরে তৈরি বা বিকৃত করা হয়েছে। সমালোচক জেসন কোলাভিটো (Jason Colavito) দেখিয়েছেন যে জ্যাকোলিওর ‘অকাল্ট সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া’ (Occult Science in India, 1879) বইটিতে ‘নয় অজ্ঞাত পুরুষ’-এর মতো কোনো সমাজের উল্লেখ নেই। সেখানে যা পাওয়া যায় তা হলো, নয়জন ব্রাহ্মণের অগ্নি রক্ষার দায়িত্বে থাকার কথা—এবং সেটিও একটি গ্রন্থের উল্লেখ সহ, যা জ্যাকোলিও নিজেই উপস্থাপন করেছিলেন এবং যা পণ্ডিতরা নির্ভরযোগ্য প্রাচীন উৎস বলে মনে করেন না। ‘নয় অজ্ঞাত’ বাক্যটি পোভেলস-বার্জিয়েরের পরেই পুনরাবৃত্ত হতে থাকে, জ্যাকোলিওর মূল লেখা থেকে নয়।

পোপ সিলভেস্টার দ্বিতীয় (Gerbert of Aurillac) ইউরোপীয় মধ্যযুগে গণিত এবং আরবি বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; তাঁর নামে कांस्य মূর্তি এবং কথা বলার মতো কিংবদন্তি ইউরোপে প্রচলিত ছিল। তাঁর ভারতে এসে নয়জনের সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি সেই ১৯৬০ সালের বইয়ের একটি সংযোজন, সেই সময়ের পোপের কোনো প্রাচীন নথিপত্র থেকে নয়। এর পর থেকে ইংরেজি ইন্টারনেট নিবন্ধগুলো প্রায়শই একই অধ্যায়কে বারবার উল্লেখ করে: কলিঙ্গ যুদ্ধ, নয়টি বই, জ্যাকোলিও, পোপ, এবং শেষে ‘কে জানে, হয়তো সত্যি’। কপি-পেস্টের এই ধারা কাহিনিটিকে প্রাচীনত্ব দেয় না।

সত্যি কথা: অশোকের সময়ের শিলালিপিগুলোতে নয়জন গুপ্ত পুরুষ বা নয়টি নিষিদ্ধ বিজ্ঞান-গ্রন্থের কোনো উল্লেখ নেই। ‘নাইন আননোন’ নামটি আধুনিক ইংরেজি উপন্যাস (১৯২৩, ‘অ্যাডভেঞ্চার’ পত্রিকা) থেকে জনসমক্ষে আসে; ১৯৬০ সালের ‘দ্য মর্নিং অফ দ্য ম্যাজিশিয়ানস’ এটিকে প্রাচীন সত্যের মতো উপস্থাপন করে।

নয়টি বই: তালিকার উৎস কোথায়?

বর্তমানে যে তালিকাটি প্রচলিত, তাতে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো—প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ; শরীর-বিজ্ঞান ও ‘মৃত্যু-স্পর্শ’; অণুজীব; কিমিয়া/ধাতু রূপান্তর; যোগাযোগ (এমনকি মহাকাশের সঙ্গেও); মহাকর্ষ ও বিমান; মহাবিশ্বের সৃষ্টি; আলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার; এবং সমাজের উত্থান-পতন। পরবর্তীকালে কিছু ওয়েবসাইটে জুডোকে দ্বিতীয় বইয়ের এবং বৈমানিক শাস্ত্রকে ষষ্ঠ বইয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এটি কোনো মৌর্যকালীন গ্রন্থাগারের তালিকা নয়। মুন্ডির উপন্যাস এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমা রহস্য-সাহিত্যে বিষয়গুলো ভাগ করা হয়েছিল; পোভেলস-বার্জিয়ের এবং তাদের অনুসারীরা এই তালিকাটিকে একটি ‘প্রাচীন পাঠ্যক্রম’-এর মতো স্থির করে দেয়। বিংশ শতাব্দীর পাঠকরা যে বিষয়গুলোকে বিপজ্জনক মনে করত—প্রচার, ব্যাকটেরিয়া, পারমাণবিক শক্তি/মহাকর্ষ, জনমানস—সেগুলোই অধ্যায় হয়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর শিলালিপিগুলো এই শিরোনামে কথা বলে না।

‘ফাঁস’ হওয়া তথ্যের দাবিগুলোও একই রকম। জুডো জাপানের নিজস্ব ঐতিহাসিক ধারা বহন করে। বৈমানিক শাস্ত্র বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একটি পাঠ্য, যা বিমান চালনার ইতিহাসবিদরা প্রাচীন উড়ন্ত যন্ত্রের ম্যানুয়াল হিসেবে গণ্য করেন না। মন্দিরে হঠাৎ সোনা পাওয়া, কলেরা বা ম্যালেরিয়ার গোপন ওষুধ, ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ—এই বিষয়গুলো কাহিনিকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু প্রাচীন প্রমাণ যোগ করে না। তালিকাটি মনে রাখার মতো, তাই এটি টিকে আছে। কিন্তু মনে রাখার মতো হলেই তা প্রমাণ হয় না।

বারবার যুক্ত হওয়া নাম ও প্রমাণ—এবং কেন তা টেকে না

একটি দাবি হলো, এই গোষ্ঠী এতটাই সফল যে তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ না থাকাই তাদের সাফল্যের প্রমাণ। এই যুক্তি যেকোনো মনগড়া প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে পারে, কারণ এটি ভুল প্রমাণ করার পথ বন্ধ করে দেয়। ইতিহাস ভিন্নভাবে কাজ করে: যে প্রতিষ্ঠান দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকে, সম্পদ পরিচালনা করে, পোপদের সঙ্গে দেখা করে, মহামারী প্রতিরোধ করে—তার কোনো না কোনো ছাপ মুদ্রা, চিঠি, শিলালিপি, বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ বা স্বয়ং অশোকের পাথরে পড়া উচিত ছিল। কিন্তু তেমন কোনো ছাপ নেই।

কিছু ব্লগ যারা মেগাস্থিনিস (Megasthenes), হিউয়েন সাং (Xuanzang), বা আল-বিরুনি (Al-Biruni)-এর মতো ঐতিহাসিকদের উল্লেখ করে ‘নয় পুরুষকে দেখা গেছে’ বলে দাবি করে, তারা কোনো প্রাথমিক উৎস দেয় না। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিসের বিবরণ মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সময়কালের, যেখানে এই গোষ্ঠীর কোনো উল্লেখ নেই। পরবর্তীকালের পর্যটকরা বৌদ্ধ বিহার, ধর্মগ্রন্থ, রাজকীয় রীতিনীতি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু নয়জন অমর রক্ষকের কথা বলেননি।

উদ্ধৃতি ছাড়াই নাম জুড়ে দেওয়া সেই একই ধারার অংশ, যেখানে জগদীশ চন্দ্র বসু এবং বিক্রম সারাভাইকে সদস্য বানানো হয়। সাহিত্যে কাহিনিটি এগিয়ে গেছে, এবং সেটাই তার আসল জায়গা। ক্লাইভ ক্যাসলারের ‘শ্যাডো টাইরান্টস’ (Shadow Tyrants), ক্রিস্টোফার ডয়েলের ‘দ্য মহাভারত সিক্রেট’ (The Mahabharata Secret), শোভা নিহালানির ‘নাইন’ ট্রিলজি (Nine trilogy), সাপন सक्सेना (Sapan Saxena), অংশুল দুপারে (Anshul Dupare)-এর ‘অশোক অ্যান্ড দ্য নাইন আননোন’ (Ashok and the Nine Unknown), সনি লিভের ‘জেএল৫০’ (JL50)—এই সব সৃষ্টি নিজেদের উপন্যাস বা ওয়েব সিরিজ হিসেবে পরিচয় দেয়। অ্যান্টন লাভে (Anton LaVey)-এর ‘স্যাটানিক বাইবেল’ (Satanic Bible, 1969)-এর প্রথম সংস্করণের উৎসর্গীকরণে নয় অজ্ঞাতদের নাম শেষ দিকে রয়েছে—এটি পপ-সংস্কৃতির একটি চিহ্ন, মৌর্য যুগের প্রমাণ নয়। আমেরিকান টিভি সিরিজ ‘হিরোস’ (Heroes)-এর লেখকরা এই নয় সংখ্যার জন্য এই কাহিনিটিকে প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এটি কাহিনির প্রভাব, শিলালিপির পাঠ নয়।

এই কাহিনি কেন আজও টিকে আছে?

সম্রাট অশোক সত্যিই একজন বিরল শাসক ছিলেন। যুদ্ধের পর তাঁর অনুতাপ প্রকাশ করা, ধর্মকে বিজয়ের চেয়ে বড় মনে করা, এবং স্তম্ভে সহিষ্ণুতার কথা খোদাই করা—এগুলো খুব কমই দেখা যায়। এইচ. জি. ওয়েলস তাঁর ‘দ্য আউটলাইন অফ হিস্টোরি’ (The Outline of History)-তে অশোককে ইতিহাসের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেই উজ্জ্বলতার চারপাশে মানুষ ও কাহিনি জড়ো করা সহজ। নয়জন গুপ্ত ব্যক্তি সেই উজ্জ্বলতার একটি আধুনিক অলঙ্কার হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত, আমরা প্রাচীন ভারতকে কেবল মন্দির ও যুদ্ধের ভূমি হিসেবে নয়, একটি পরীক্ষাগার হিসেবেও দেখতে চাই। গণিত, ধাতুবিদ্যা, আয়ুর্বেদ, ব্যাকরণ—এগুলো প্রকৃত ঐতিহ্য, যা গ্রন্থ ও অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত। নয় অজ্ঞাত পুরুষ সেই প্রকৃত ঐতিহ্যকে ‘সুপার-সায়েন্স + সুপার-গোপনীয়তা’-তে শর্টকাট করে দেয়। শর্টকাট মজাদার। এর মূল্য হলো, পাথরে খোদাই করা অশোক পেছনে পড়ে থাকে এবং ১৯২৩ সালের পাল্প ফিকশন সামনে চলে আসে।

তৃতীয় কারণ হলো মিডিয়ার প্রভাব। একটি ভিডিওতে কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্ত, নয়টি ছায়ামূর্তি এবং ‘সরকার এটি গোপন করছে’ বলে দিলেই ক্লিপটি ভাইরাল হয়ে যায়। শিলালিপি পড়া একটি ধীর প্রক্রিয়া। তাই একটি নিরীক্ষা জরুরি: কোন কথাটি অশোকের, কোনটি মুন্ডির, কোনটি ১৯৬০ সালের ফরাসি বইয়ের, আর কোনটি গতকালের রিলসের? এই তিনটিকে এক করে দেখা যায় না।

FAQ

সম্রাট অশোক কি সত্যিই নয় অজ্ঞাত পুরুষ তৈরি করেছিলেন?

সেই সময়ের শিলালিপি বা প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এমন কোনো গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধের অনুতাপ এবং তাঁর ধর্মীয় নীতি নথিভুক্ত আছে; কিন্তু নয়জন গুপ্ত রক্ষকের কোনো উল্লেখ নেই।

তাহলে এই কাহিনিটি কোথা থেকে এল?

এর আধুনিক জনপ্রিয় রূপটি ট্যালবট মুন্ডির ১৯২৩ সালের উপন্যাস ‘দ্য নাইন আননোন’ থেকে এসেছে। ১৯৬০ সালে পোভেলস এবং বার্জিয়ের এটিকে প্রাচীন সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। এরপর থেকে একই কাহিনি বারবার অনুলিখিত হয়েছে।

লুই জ্যাকোলিও কি এটি আগে লিখেছিলেন?

পোভেলস ও বার্জিয়ের এমনটাই দাবি করেন। কিন্তু জ্যাকোলিওর যে বইটি প্রায়শই উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়, সেখানে এই সমাজ সেই রূপে পাওয়া যায় না। নয়জন ব্রাহ্মণের অগ্নি রক্ষার যে উল্লেখ আছে, তা একটি ভিন্ন প্রসঙ্গে এবং বিতর্কিত পাঠের উপর নির্ভরশীল।

নয়টি বইয়ে বিমান ও মৃত্যু-স্পর্শ কি প্রাচীন বিজ্ঞান?

এটি পরবর্তীকালের একটি জনপ্রিয় তালিকা, মৌর্য যুগের পাঠ্যক্রম নয়। বিমান এবং স্পর্শ-মৃত্যুর মতো বিষয়গুলো বিংশ শতাব্দীর রহস্য-কাহিনি এবং ইন্টারনেট রিটেলিংয়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে।

কোনো ভারতীয় উপন্যাস বা ওয়েব সিরিজ কি এর প্রমাণ হতে পারে?

না। ‘জেএল৫০’ বা পরবর্তীকালের হিন্দি/ইংরেজি উপন্যাসগুলো সবই কাহিনি। এগুলো কাহিনিকে ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু শিলালিপির স্থান দখল করতে পারে না।

দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি সম্রাট অশোকের নথিভুক্ত ইতিহাস এবং ‘নয় অজ্ঞাত পুরুষ’-এর আধুনিক কাহিনির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরার জন্য লেখা হয়েছে। এটি কোনো গুপ্ত সংগঠন খোঁজা, তাতে যোগ দেওয়া বা ‘গুপ্ত গ্রন্থ’ চাওয়ার নির্দেশিকা নয়। উপন্যাস, ওয়েব সিরিজ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিডিওগুলো কোনো প্রমাণ নয়। শিলালিপি হলো সর্বজনীন উৎস; সেগুলোর উপর কাল্পনিক সদস্যদের তালিকা যোগ করা উচিত নয়।

विज्ञापन

🆕 সম্পর্কিত পোস্ট

স্বপ্নের আসল মানে কী? জানুন স্বপ্নের বিজ্ঞান

স্বপ্নের আসল মানে কী? জানুন স্বপ্নের বিজ্ঞান

Mind
মন শান্ত করার উপায়: অস্থির মুহূর্তে ছোট ও বাস্তব অনুশীলন

মন শান্ত করার উপায়: অস্থির মুহূর্তে ছোট ও বাস্তব অনুশীলন

Mind
ওভারথিংকিং কমাবেন কীভাবে? একই চিন্তা ঘুরতে থাকলে সহজ পদক্ষেপ

ওভারথিংকিং কমাবেন কীভাবে? একই চিন্তা ঘুরতে থাকলে সহজ পদক্ষেপ

Mind
মানসিক চাপের লক্ষণ কী? ঘুম, মেজাজ ও শরীরের পরিবর্তন বুঝুন

মানসিক চাপের লক্ষণ কী? ঘুম, মেজাজ ও শরীরের পরিবর্তন বুঝুন

Mind
विज्ञापन
একাকিত্ব কাটানোর উপায়: সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা থেকে বাস্তব যোগাযোগ

একাকিত্ব কাটানোর উপায়: সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা থেকে বাস্তব যোগাযোগ

Mind
বার্নআউটের লক্ষণ কী? কাজের ক্লান্তি, দূরত্ব ও সাহায্যের সময়

বার্নআউটের লক্ষণ কী? কাজের ক্লান্তি, দূরত্ব ও সাহায্যের সময়

Mind
শরীর, মন ও আত্মার শুদ্ধি: আধ্যাত্মিক অভ্যাস আর ডিটক্সের দাবির তফাত

শরীর, মন ও আত্মার শুদ্ধি: আধ্যাত্মিক অভ্যাস আর ডিটক্সের দাবির তফাত

Mind
খারাপ স্বপ্ন কেন হয়? বারবার দুঃস্বপ্ন দেখলে কী করবেন

খারাপ স্বপ্ন কেন হয়? বারবার দুঃস্বপ্ন দেখলে কী করবেন

Mind
विज्ञापन
Vivek Hardaha Written by: Writer, YouTuber and tool builder · Madhya Pradesh

Vivek has been online since 2012 and has worked since 2014 across YouTube, blogs and news platforms. He holds an M.Sc. in Computer Science and an M.A. in Sociology. On Vista Hub he writes practical, plain-language guides on tech, money, health, farming and festivals.

Vista Hub এখন WhatsApp-এ নতুন পোস্ট আর ফ্রি টুলসের আপডেট সরাসরি WhatsApp-এ পান। যোগ দিন →

🆕 নতুন পোস্ট

সব দেখুন →